সুন্দর ত্বক চাইলে আজই ছাড়ুন ধূমপান

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর—এই চিরন্তন সত্যটি আমরা সবাই জানি। সাধারণত ধূমপানের কথা উঠলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ফুসফুসের ক্যানসার বা হৃদরোগের মতো মারাত্মক সব ব্যাধির ছবি। কিন্তু আপনি কি জানেন, তামাকের প্রতিটি টান আপনার শরীরের ভেতরের অঙ্গগুলোর পাশাপাশি বাইরের সবচেয়ে বড় অংশ তথা ‘ত্বক’ বা স্কিনকে কতটা নিঃশব্দে ধ্বংস করে চলেছে?
চিকিৎসক ও চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ধূমপানের ফলে একজন মানুষের প্রকৃত বয়সের চেয়ে তাকে অনেক বেশি বয়স্ক দেখায়। তামাকের ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো ত্বকের ভেতরের কোষ নষ্ট করে অকাল বার্ধক্য তো ডেকে আনবেই, পাশাপাশি এটি ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। চলুন জেনে নেওয়া যাক কীভাবে ধূমপান আপনার বাহ্যিক সৌন্দর্য ও ত্বকের স্বাস্থ্যকে চিরতরে কেড়ে নেয়:
১. অকাল বার্ধক্য ও ‘স্মোকার্স ফেস’
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ধূমপায়ীদের চেহারার বিশেষ পরিবর্তনকে ‘স্মোকার্স ফেস’ বলা হয়। সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা নিকোটিন ত্বকের রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে ফেলে।
- অক্সিজেনের অভাব: রক্তনালী সরু হয়ে যাওয়ার কারণে ত্বকের উপরিভাগে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন এবং পুষ্টি উপাদান (যেমন ভিটামিন এ) পৌঁছাতে পারে না। ফলে ত্বক তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা হারিয়ে ম্যাড়ম্যাড়ে, ধূসর বা ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
- বলিরেখা বা রিংকেলস: নিকোটিন ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখার মূল উপাদান ‘কোলাজেন’ এবং ‘ইলাস্টিন’ নামক প্রোটিনগুলোকে ভেঙে ফেলে। এর ফলে অল্প বয়সেই চোখের কোণ কপালে এবং মুখের চারপাশে গভীর বলিরেখা বা চামড়া ঝুলে পড়ার মতো অকাল বার্ধক্যের লক্ষণ দেখা দেয়।
২. ঠোঁট ও মাড়ির কালচে ভাব
সিগারেটের ধোঁয়া এবং তাপের সরাসরি সংস্পর্শে আসার কারণে ধূমপায়ীদের ঠোঁট ও মাড়ির স্বাভাবিক গোলাপি ভাব নষ্ট হয়ে যায়। তামাকের নিকোটিন ত্বকে মেলানিনের (রঞ্জক পদার্থ) উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে ঠোঁট ও মাড়ি কালচে খয়েরি বা নীলচে রঙের হয়ে যায়, যা দেখতে অত্যন্ত অস্বস্তিকর লাগে।
৩. ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি
সিগারেটের ভেতরের টক্সিন বা বিষাক্ত রাসায়নিকগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।
- স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা: গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ধূমপান করেন তাদের এক বিশেষ ধরণের ত্বকের ক্যানসার, যা ‘স্কোয়ামাস সেল কার্সিনোমা’ নামে পরিচিত, তার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি। বিশেষ করে ধূমপায়ীদের ঠোঁটের চারপাশে এই ক্যানসারের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
৪. ক্ষত শুকাতে দীর্ঘ সময় লাগা
তামাকের নিকোটিন রক্ত চলাচল ধীর করে দেওয়ার কারণে শরীরের কোনো স্থানে কেটে গেলে বা ত্বকে কোনো অস্ত্রোপচার হলে সেই ক্ষত শুকাতে সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। এছাড়া ক্ষতস্থানে ইনফেকশন বা জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়।
৫. সোরিয়াসিস ও একজিমার তীব্রতা বৃদ্ধি
ধূমপান শরীরের ভেতরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট করে প্রদাহ তৈরি করে। এর ফলে ‘সোরিয়াসিস’-এর মতো জঘন্য চর্মরোগের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই রোগে ত্বকে চুলকানিযুক্ত আঁশের মতো লালচে আস্তরণ তৈরি হয়, যা অত্যন্ত কষ্টদায়ক।
ক্ষতিপূরণের একমাত্র উপায়: আজই ধূমপান বর্জন
অনেকেই ভাবেন, দামী অ্যান্টি-এজিং ক্রিম, সিরাম বা ফেসিয়াল করে হয়তো ধূমপানের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, ভেতর থেকে ক্ষতি সচল রেখে বাইরে কৃত্রিম প্রলেপ দিলে কোনো লাভ হবে না। সুখবর হলো, আপনি আজই ধূমপান ছেড়ে দিলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ত্বকে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করবে এবং ত্বকের হারানো উজ্জ্বলতা ধীরে ধীরে ফিরে আসবে।
ধূমপান কেবল আপনার আয়ুই কমায় না, বরং বেঁচে থাকার দিনগুলোতে আপনার ব্যক্তিত্ব ও বাহ্যিক সৌন্দর্যকেও ম্লান করে দেয়। আয়নায় অকাল বার্ধক্যের ছাপ আর ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে আজই তামাককে ‘না’ বলুন। নিজের ত্বক ও সুস্থতাকে ভালোবাসুন।
ভোরের আকাশ/জেআ