ভিটামিনের ঘাটতি কীভাবে নাক থেকে রক্তপাতের কারণ হয়

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় নাক দিয়ে রক্ত পড়াকে বলা হয় ‘এপিস্ট্যাক্সিস’ (Epistaxis)। হঠাৎ করে নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখলে যে কেউই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সাধারণত অতিরিক্ত গরম, শুষ্ক আবহাওয়া, নাকে আঘাত লাগা কিংবা সর্দি-কাশির কারণে নাকের ভেতরের নরম রক্তনালী ছিঁড়ে রক্তপাত হতে পারে। তবে অনেকেই জানেন না যে, শরীরে নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিনের দীর্ঘমেয়াদী ঘাটতি বা অভাবের কারণেও নাক দিয়ে রক্ত পড়ার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।
রক্ত জমাট বাঁধতে এবং রক্তনালীগুলোকে শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে এমন প্রধান কয়েকটি ভিটামিনের অভাব নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. ভিটামিন কে (Vitamin K)
নাক দিয়ে রক্ত পড়ার পেছনে সবচেয়ে প্রধান এবং সাধারণ পুষ্টিগত কারণ হলো শরীরে ভিটামিন কে-এর অভাব।
- শরীরে এর ভূমিকা: ভিটামিন কে আমাদের লিভারে ‘প্রোথ্রোম্বিন’ নামক একটি উপাদান তৈরিতে সাহায্য করে, যা রক্ত জমাট বাঁধতে (Blood Clotting) প্রধান ভূমিকা পালন করে। শরীরে কোথাও কেটে গেলে বা রক্তনালী ছিঁড়ে গেলে এই ভিটামিনের কল্যাণেই রক্তপাত দ্রুত বন্ধ হয়।
- অভাব হলে কী ঘটে: শরীরে ভিটামিন কে-এর ঘাটতি হলে রক্ত সহজে জমাট বাঁধতে পারে না। ফলে নাকের ভেতরের অতি সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলো সামান্য শুষ্ক হলে বা চাপ পেলে যে রক্তপাত শুরু হয়, তা সহজে থামতে চায় না এবং ঘন ঘন নাক দিয়ে রক্ত পড়ে।
- উৎস: পালং শাক, ব্রোকলি, বাঁধাকপি, সরিষা শাক, শালগম এবং ডিমের কুসুম।
২. ভিটামিন সি (Vitamin C)
ভিটামিন সি কেবল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাই বাড়ায় না, এটি আমাদের রক্তনালীর সুরক্ষাকবচ হিসেবেও কাজ করে।
- শরীরে এর ভূমিকা: শরীরে ‘কোলাজেন’ নামক প্রোটিন তৈরিতে ভিটামিন সি অপরিহার্য। এই কোলাজেন আমাদের শরীরের কোষ, ত্বক এবং নাকের ভেতরের সংবেদনশীল রক্তনালীগুলোর দেয়ালকে মজবুত ও নমনীয় রাখে।
- অভাব হলে কী ঘটে: ভিটামিন সি-এর তীব্র অভাবে রক্তনালীগুলোর দেয়াল অত্যন্ত ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে পড়ে (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ক্যাপিলারি ফ্রেজিলিটি’ বলা হয়)। এর ফলে সামান্য হাঁচি, কাশি বা নাক চুলকালেই রক্তনালী ফেটে রক্ত বের হয়ে আসে। এছাড়া এর অভাবে মাড়ি দিয়েও রক্ত পড়তে পারে (স্কার্ভি রোগ)।
- উৎস: লেবু, কমলা, আমলকী, পেয়ারা, মাল্টা, কাঁচামরিচ ও টমেটো।
৩. ভিটামিন ডি (Vitamin D)
হাড়ের গঠনের জন্য ভিটামিন ডি পরিচিত হলেও রক্তনালীর স্বাস্থ্য রক্ষায় এর পরোক্ষ ভূমিকা রয়েছে।
- শরীরে এর ভূমিকা: ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে। ক্যালসিয়াম কেবল হাড় মজবুত করে না, এটি রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ারও (Coagulation Cascade) একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
- অভাব হলে কী ঘটে: ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-এর সম্মিলিত ঘাটতি হলে রক্তনালীর সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা ব্যাহত হয় এবং রক্ত জমাট বাঁধার গতি মন্থর হয়ে যায়, যা নাকের রক্তপাতকে তরান্বিত করতে পারে।
- উৎস: সূর্যের আলো, সামুদ্রিক মাছ, মাশরুম, দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবার।
ভিটামিনের অভাব ছাড়া অন্যান্য সাধারণ কিছু কারণ:
- অতিরিক্ত শুষ্ক ও গরম আবহাওয়া (যার কারণে নাকের ভেতরের চামড়া ফেটে যায়)।
- আঙ্গুল দিয়ে নাক চুলকানো বা জোরে নখ লাগা।
- উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure)।
- এসপিরিন বা রক্ত পাতলা করার ঔষধের অতিরিক্ত ব্যবহার।
নাক দিয়ে রক্ত পড়লে তাৎক্ষণিক করণীয়:
১. সামনের দিকে ঝুঁকুন: রক্ত পড়া শুরু হলে সোজা হয়ে বসুন এবং মাথাটি সামান্য সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে দিন (অনেকে মাথা পিছনের দিকে হেলিয়ে দেন, যা ভুল। এতে রক্ত শ্বাসনালীতে বা পেটে চলে যেতে পারে)।
২. নাক চেপে ধরুন: বুড়ো আঙুল এবং তর্জনী দিয়ে নাকের নরম অংশটি (দুই ছিদ্র বন্ধ করে) শক্ত করে চেপে ধরুন এবং মুখ দিয়ে শ্বাস নিন। এভাবে টানা ৫ থেকে ১০ মিনিট চেপে রাখুন।
৩. বরফ ব্যবহার: নাকের ওপর এবং কপালে বরফ বা ঠান্ডা কাপড়ের সেঁক দিতে পারেন, এতে রক্তনালী সংকুচিত হয়ে রক্ত পড়া দ্রুত বন্ধ হয়।
বিশেষ সতর্কবার্তা: যদি ঘরোয়া উপায়ে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেও নাক দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ না হয়, রক্তপাতের পরিমাণ খুব বেশি হয় কিংবা ঘন ঘন এই সমস্যা হতে থাকে—তবে ঘরে বসে না থেকে অবিলম্বে একজন নাক-কান-গলা (ENT) বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়া উচিত। কারণ এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ অন্য কোনো জটিল রোগের লক্ষণও হতে পারে।
ভোরের আকাশ/জেআ