ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট কি স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে?

স্মৃতিশক্তি বাড়ানো ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখার আশায় অনেকেই ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন। মাছের তেল থেকে তৈরি এসব সাপ্লিমেন্টকে প্রায়ই মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হিসেবে প্রচার করা হয়। তবে প্রশ্ন হলো, নিয়মিত ওমেগা-৩ ক্যাপসুল খেলেই কি স্মৃতিশক্তি বাড়ে? গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ওমেগা-৩ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে সবার স্মৃতিশক্তি বাড়ে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
মস্তিষ্কের জন্য ওমেগা-৩ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ওমেগা-৩ একধরনের প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিড। এর দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ইপিএ (EPA) ও ডিএইচএ (DHA)। বিশেষ করে ডিএইচএ মস্তিষ্কের কোষের ঝিল্লির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। স্নায়ুকোষের স্বাভাবিক গঠন ও কার্যক্রমে এর ভূমিকা রয়েছে।
সামুদ্রিক মাছ, বিশেষ করে তৈলাক্ত মাছে ওমেগা-৩ পাওয়া যায়। এ ছাড়া মাছের তেল, অ্যালগাল অয়েল এবং কিছু উদ্ভিজ্জ খাবারেও বিভিন্ন ধরনের ওমেগা-৩ থাকে। তবে সব উৎসে একই ধরনের ওমেগা-৩ বা সমপরিমাণ উপাদান পাওয়া যায় না।
গবেষণা কী বলছে?
ওমেগা-৩ ও স্মৃতিশক্তির সম্পর্ক নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। কিছু পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা নিয়মিত মাছ খান, তাঁদের মধ্যে বয়সজনিত জ্ঞানীয় অবক্ষয়ের ঝুঁকি তুলনামূলক কম হতে পারে। তবে শুধু মাছের ওমেগা-৩-ই এর কারণ কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। মাছের অন্যান্য পুষ্টি উপাদান, সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট নিয়ে পরিচালিত নিয়ন্ত্রিত গবেষণার ফল একরকম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) তথ্য অনুযায়ী, সুস্থ বয়স্ক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে স্মৃতিশক্তি বা সামগ্রিক জ্ঞানীয় কার্যক্ষমতার উল্লেখযোগ্য উন্নতি পাওয়ার ধারাবাহিক প্রমাণ নেই। আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এসব সাপ্লিমেন্ট রোগের অগ্রগতি ধীর করে—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে মৃদু জ্ঞানীয় সমস্যায় আক্রান্ত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষায় সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। সূত্র: এনআইএইচের ওমেগা-৩ বিষয়ক তথ্যপত্র।
২০২৫ সালে প্রকাশিত সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এর একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা ও মেটা-বিশ্লেষণে ৫৮টি গবেষণা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এতে ওমেগা-৩ গ্রহণের সঙ্গে স্মৃতি, মনোযোগ ও অন্যান্য জ্ঞানীয় দক্ষতার কিছু ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে গবেষণাগুলোর ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল এবং কয়েকটি ফলাফলের ক্ষেত্রে প্রমাণের নিশ্চয়তা কম। গবেষকেরা দীর্ঘমেয়াদি ও আরও উন্নতমানের পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন। ফলে এই ফলাফলকে সবার ক্ষেত্রে সাপ্লিমেন্টে স্মৃতিশক্তি বাড়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা যাবে না। সূত্র: Scientific Reports, ২০২৫।
তাহলে কি ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট নেওয়া উচিত?
শুধু স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট শুরু করা উচিত নয়। কারও খাদ্যতালিকায় ওমেগা-৩-এর ঘাটতি থাকলে বা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত কারণে প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে প্রয়োজন ছাড়া বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা নির্দিষ্ট ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
ওমেগা-৩ পাওয়ার জন্য খাদ্যতালিকায় মাছ রাখা একটি বাস্তবসম্মত উপায়। পাশাপাশি সুষম খাবার, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো সমস্যার নিয়ন্ত্রণ মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে আর কী করা যায়?
স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ ধরে রাখতে শুধু একটি সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক জীবনযাপনে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত ঘুম, শারীরিক সক্রিয়তা, পুষ্টিকর খাবার, সামাজিক যোগাযোগ এবং নতুন কিছু শেখার অভ্যাস মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
হঠাৎ স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, দৈনন্দিন কাজ ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়া বা চিন্তাভাবনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এসব সমস্যার পেছনে ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য কোনো শারীরিক কারণ থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, ওমেগা-৩ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর নিশ্চিত উপায় হিসেবে সাপ্লিমেন্টের কার্যকারিতা এখনো প্রতিষ্ঠিত নয়। তাই সাপ্লিমেন্টের ওপর নির্ভর না করে পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনকে অগ্রাধিকার দেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
ভোরের আকাশ/জেআ