প্রতিকূলতা জয় করে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেল পূজা

অনলাইন আইপিএল জুয়ায় জড়িয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে রাতের আঁধারে পাড়ি জমিয়েছেন কলকাতায়। প্রায় আট মাস স্ত্রী-সন্তানরা জানতেন না তিনি কোথায় আছেন। বাবার এমন সিদ্ধান্তে ভেঙে পড়ে পরিবার। নেমে আসে চরম অভাব-অনটন। তবে মায়ের সংগ্রাম ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে সব প্রতিকূলতা জয় করে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছে পূজা রায়।
পূজা রায় ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার চাঁদহাট এলাকার জয়দেব রায়ের মেয়ে। চার বছর আগে আর্থিক সংকটের কারণে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়ি মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার ভদ্রাসন ইউনিয়নের সাহাপাড়া গ্রামে চলে আসেন তার মা সোমা রায়। পূজা এ বছর শিবচরের উমেদপুর এলাকার ড. নুরুল আমীন কলেজের ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
পূজার বাবা অনলাইন আইপিএল জুয়ায় জড়িয়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়ে কলকাতায় চলে যান। প্রায় আট মাস পর পরিবার জানতে পারে, তিনি সেখানে টেইলরের কাজ করছেন। দুই-তিন মাস পরপর কিছু টাকা পাঠালেও তা দিয়ে সংসারের অভাব মেটে না।
স্বামীর অনুপস্থিতিতে তিন সন্তানকে নিয়ে কঠিন সংগ্রামে নামেন সোমা রায়। সেলাই মেশিনে কাজ করে এবং বাবার বাড়িতে বিভিন্ন কাজ করে সংসার চালান তিনি। অন্যদিকে পূজাও টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করেছে। কলেজের বেতন নিয়মিত দিতে না পারলেও শিক্ষকদের সহযোগিতায় পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সে।
কিন্তু জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও পূজার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া। আর্থিক সংকটের কারণে ভর্তি কোচিং করার সুযোগ হয়নি তার। মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে চাইলেও অর্থের অভাবে অনিশ্চয়তায় পড়েছে সেই স্বপ্ন। এ জন্য সরকার, বিত্তবান ও শিক্ষানুরাগীদের সহযোগিতা কামনা করেছে তার পরিবার।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকর্মীরা পূজার সাফল্যের খবর পেয়ে মিষ্টি ও ফুল নিয়ে তার নানা বাড়িতে যান। সেখানে পূজার পরিবারের সংগ্রামের কথা জানতে পারেন তারা।
পূজা রায় জানায়, “ছোটবেলা থেকেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখি। মা অনেক কষ্ট করে আমাদের মানুষ করছেন। তাঁর কষ্টের কথা চিন্তা করেই পড়াশোনায় মনোযোগী হয়েছি। কলেজে সব সময় বেতন দিতে পারিনি, তবে শিক্ষকেরা সহযোগিতা করেছেন। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাই। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে ভর্তি কোচিং করতে পারিনি। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা পেলে আমার স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।”
পূজার মা সোমা রায় বলেন, “স্বামী চলে যাওয়ার পর তিন সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। সেলাইয়ের কাজ করে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিচ্ছি। মেয়ের ফলে আমি খুব খুশি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সামর্থ্য আমার নেই। টাকার অভাবে মেয়েটি যেন স্বপ্ন বিসর্জন না দেয়, এটাই আমার চাওয়া।”
ড. নুরুল আমীন কলেজের অধ্যক্ষ মো. লুৎফর রহমান বলেন, “পূজা আমাদের কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে। মেয়েটি আর্থিকভাবে অসচ্ছল। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পর থেকেই তার মেধার বিষয়টি আমার নজরে আসে। শিক্ষকদের দিয়ে তাকে বিশেষভাবে গাইড করিয়েছি। তার পড়া চালিয়ে যেতে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাই।”
ভোরের আকাশ/ এনউব