অবহেলা আর অপমানের দেয়ালে বন্দি গাইবান্ধার হরিজন সম্প্রদায়; খেতে পারেন না রেস্তোরাঁয় বসে

ভোরের আলো ফোটার আগেই হাতে ঝাড়ু নিয়ে শহরের রাস্তায় নেমে পড়েন তারা। যুগের পর যুগ শহরের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করে পরিচ্ছন্ন রাখছেন, অথচ বিনিময়ে জোটে না সম্মান কিংবা সমঅধিকার। শুধুমাত্র ‘সুইপার’ পরিচয়ের কারণে আজও আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে খেতে পারেন না গাইবান্ধার হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। চায়ের দোকানে কাঁচের কাপে চা পান করাও যেন তাদের জন্য অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ।
গাইবান্ধা শহরের হরিজন পল্লীর মৌ রানী, স্বপন কিংবা রাজেশদের জীবনের গল্প যেন অবহেলা আর বৈষম্যের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁয় গেলে তাদের ভেতরে বসতে দেওয়া হয় না। বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে টিস্যু বা কাগজে মুড়িয়ে হাতে তুলে দেওয়া হয় খাবার। চায়ের দোকানেও একই চিত্র কাঁচের কাপ নয়, চা দেওয়া হয় অন-টাইম গ্লাসে কিংবা বাড়ি থেকে নিয়ে আসা আলাদা মগে।
মৌ রানী বাসফোর আক্ষেপ করে বলেন,আমাদের কাচের কাপে চা দেয় না। আমরা সুইপার বলে দোকানের ভেতরে বসতেও দেয় না। বাইরে থেকেই খাবার দেয়। অপমান সহ্য করেই বাঁচতে হচ্ছে। আমাদের সঙ্গে এ কেমন আচরণ।
গাইবান্ধা শহরের ঘাঘট নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা হরিজন পল্লীতে বসবাস করছে ৮৪টি পরিবার। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই পল্লীর দেয়াল ঘেঁষেই জেলা প্রশাসকের বাসভবন। দেয়ালের ওপারে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ছোঁয়া থাকলেও এপারে হরিজনদের জীবন যেন থেমে আছে অবহেলা আর অনিশ্চয়তায়।
বর্ষা এলেই দুর্ভোগ আরও বাড়ে। বৃষ্টির পানি চুঁইয়ে পড়ে ঘরে, ভাঙা টিনের চাল দিয়ে রাত কাটে আতঙ্কে। অনেক পরিবারে নেই পর্যাপ্ত খাবার কিংবা চিকিৎসার সুযোগও।
কথা হয় অসুস্থ নারী রূপা বাসফোরের সঙ্গে। তিনি প্রতিবেদককে বলেন,'চার ছেলে আর স্বামী নিয়ে এই ছোট ঘরে থাকি। ঝড়-বৃষ্টি আসলে ঘরে থাকা যায় না। চারদিকে পানি পড়ে। না আছে ভালো ঘর, না আছে চিকিৎসা। কেউ আমাদের দিকে তাকায় না।'
বংশপরম্পরায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করলেও এখন সেই পেশাতেও টান পড়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই পেশায় যুক্ত হওয়ায় আয় কমে গেছে হরিজনদের। অনেকেই বর্তমানে মাত্র এক হাজার ৮০০ টাকা মাসিক বেতনে রাস্তা ঝাড়ুর কাজ করছেন। সরকারি চাকরির আবেদন করেও নানা ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
জানা যায়, গাইবান্ধার সদর, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ীসহ জেলার সাত উপজেলায় প্রায় এক লাখ হরিজন ও দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। দীর্ঘদিন ধরে তাদের দাবি শহরের সুবিধাজনক স্থানে একটি আবাসন কলোনি নির্মাণ করা হোক, যেখানে তারা পরিবার নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে পারবেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের আশ্বাসের বাইরে বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি।
তবে সচেতন মহলের মতে, কেবল সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ। সমাজের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার ও নাগরিক মর্যাদা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে হরিজন বাসফোর ফোরামের সাবেক সভাপতি কৃত্তন বাসফোর বলেন,' আমরা কি মানুষ না। সমাজে কি আমাদের কোনো দাম নেই। আমরাও তো এই দেশের নাগরিক, সরকারকে ভোট দেই আমরা। তাহলে আমাদের সাথে এমন আচরণ কেন। আমাদের ছেলে-মেয়েও এখন সর্বোচ্চ পড়াশোনা করছে। অথচ আমরা হোটেলে বসে খেতে পারি না আক্ষেপ নিয়ে বলছেন তিনি।'
বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অবলম্বন’ এর নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী বলেন,'সমাজের অন্য সবার মতো হরিজন জনগোষ্ঠীরও মর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধে সামাজিক সচেতনতা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দুটোই জরুরি।'
এ বিষয়ে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা ভোরের আকাশকে বলেন,'হরিজন সম্প্রদায়ের কল্যাণে আমরা কাজ করতে আগ্রহী। তাদের আবাসন ও জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখা হবে। দরিদ্র এই জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে জানান এই কর্মকর্তা।
ব্রিটিশ আমলে শহর পরিচ্ছন্নতার কাজে অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনা হয়েছিল এই জনগোষ্ঠীকে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমাজের সবচেয়ে কঠিন ও অবহেলিত কাজগুলো করে গেলেও আজও তারা বয়ে বেড়াচ্ছেন ‘অচ্ছুৎ’ পরিচয়ের সামাজিক বোঝা।
স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়েও তাই প্রশ্ন থেকে যায় যে মানুষগুলো প্রতিদিন সমাজের ময়লা পরিষ্কার করেন, তারা কবে মুক্তি পাবেন সমাজের মনোজগতের এই অন্ধকার আর বৈষম্য থেকে।
ভোরের আকাশ/এনউব