ফেনীর বিলোনীয়া বন্দরে 'ইউজার চার্জ' বসালো ভারত

নতুন বছরের শুরুতেই ফেনীর বিলোনীয়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে যাতায়াতকারী যাত্রীদের জন্য বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। ভারতের পেট্রাপোল ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্টে ‘প্যাসেঞ্জার ইউজার চার্জ (পিইউসি)’ আরোপের ফলে বিলোনীয়া–শ্রীনগর সীমান্তপথ ব্যবহারকারী যাত্রীদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে।
ভারত সরকারের অধীন ল্যান্ড পোর্টস অথরিটি অব ইন্ডিয়া (এলপিএআই)-এর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ভারত ও বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে জিএসটিসহ জনপ্রতি ২০০ রুপি এবং তৃতীয় দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে ৫০০ রুপি বা ৫ মার্কিন ডলার আদায় করা হচ্ছে। ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ রুপি ফি।
বিলোনীয়া স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ফেনী ও আশপাশের এলাকার মানুষ চিকিৎসা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা ও পারিবারিক প্রয়োজনে ভারতের ত্রিপুরা ও কলকাতায় যাতায়াত করে থাকেন। নতুন এই চার্জ যুক্ত হওয়ায় তাদের যাতায়াত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর আগে বাংলাদেশ সরকার যাত্রীপ্রতি ৫০০ টাকা ট্রাভেল ট্যাক্স আদায় করলেও চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে তা বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫৬ টাকা পোর্ট ট্যাক্সও আদায় করা হচ্ছে। এর সঙ্গে ভারতের নতুন করে আরোপিত ২০০ রুপি প্যাসেঞ্জার ইউজার চার্জ যোগ হওয়ায় সীমান্তপথে যাতায়াতের মোট খরচ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিলোনীয়া আন্তর্জাতিক চেকপোস্টে অপেক্ষমাণ যাত্রী জাহেদা খাতুন বলেন, “চিকিৎসার জন্য আমাকে বারবার ভারতে যেতে হয়। ভিসা ও ট্রাভেল ট্যাক্স দেওয়ার পর নতুন করে ২০০ রুপি দিতে হওয়ায় খরচ অনেক বেড়ে গেছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য এটা খুব কষ্টের।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী নুরুল আমীন বলেন, “বিলোনীয়া সীমান্ত দিয়ে যাতায়াতকারী বেশিরভাগ মানুষই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের। নতুন এই প্যাসেঞ্জার ইউজার চার্জ সীমান্ত এলাকার মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।”
নিয়মিত যাত্রী মঞ্জুরুল আলম বলেন, “আগে বিলোনীয়া দিয়ে যাতায়াত তুলনামূলক সহজ ও কম খরচের ছিল। এখন বাংলাদেশে কর দিয়ে বের হয়ে ভারতে ঢুকেই আবার টাকা দিতে হচ্ছে, যা অযৌক্তিক মনে হচ্ছে।”
ভারতগামী যাত্রী সুমান্ত সেন বলেন, “সেবার মান উন্নয়নের কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে যাত্রীরা এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তি পোহাচ্ছে। সেবা নিশ্চিত না করে শুধু চার্জ বাড়ানো ঠিক হয়নি।”
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা জয়া দাস বলেন, “সীমান্ত এলাকার মানুষ আত্মীয়স্বজন ও চিকিৎসার প্রয়োজনে যাতায়াত করে। মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে অন্তত এসব যাত্রার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দেওয়া উচিত।
বন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগে ২০১৯ সালে পেট্রাপোল চেকপোস্টে সীমিত পরিসরে যাত্রী সেবার নামে ইউজার চার্জ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। করোনা মহামারির সময় স্থলবন্দর দিয়ে যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেলে ওই চার্জ কার্যত তুলে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় কোনো ধরনের প্যাসেঞ্জার ইউজার চার্জ ছাড়াই যাত্রীরা এই সীমান্তপথ ব্যবহার করে আসছিলেন।
পেট্রাপোল কর্তৃপক্ষের দাবি, আধুনিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল ভবনে যাত্রীসেবার মান উন্নত করতেই এই চার্জ চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি ভোগান্তি কমাতে ডিজিটাল বুকিং ও স্লট ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিলোনীয়া স্থলবন্দর কাস্টমসের রাজস্ব কর্মকর্তা মফিজুর শিশির বলেন, “ভারতের ল্যান্ড পোর্টস অথরিটি নতুন করে এই প্যাসেঞ্জার ইউজার চার্জ আদায় করছে—এ তথ্য আমরা যাত্রীদের কাছ থেকেই জানতে পেরেছি। এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত।”
সীমান্তপথে যাতায়াতকারী ফেনীর একাধিক মানুষের দাবি, দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও মানবিক যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই চার্জ পুনর্বিবেচনা করা হোক এবং বিশেষ করে চিকিৎসা ও জরুরি যাত্রীদের জন্য ছাড়ের ব্যবস্থা করা হোক।
ভোরের আকাশ/মো.আ.