বোয়ালমারীতে জমে উঠেছে শ্রম বিক্রির হাট

ফরিদপুরের বোয়ালমারী রেলওয়ে স্টেশন ও হেলিপ্যাড চত্ত্বরে জমে উঠেছে শ্রম বিক্রির হাট। প্রায় অর্ধশত বছর ধরে চলছে এ হাট। প্রতিদিন ভোরে কোদাল, ঝুড়ি ও কাস্তে হাতে ভীড় জমান শ্রমজীবী মানুষ। জীবিকার তাগিদে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা শত শত দিনমজুর কাজের সন্ধানে প্রতিদিন এই স্থানে এসে জড়ো হন। স্থানীয় গৃহস্তরা তাদের দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরীতে কিনে নেন। স্থানীয়ভাবে এটি 'শ্রমিকের হাট' হিসেবে পরিচিত।
শ্রমিকরা জানান, এলাকায় তেমন কাজকর্ম নেই, অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয় পরিবার-পরিজন নিয়ে। তাই গ্রাম, পরিবার-পরিজন ছেড়ে কাজের সন্ধানে বোয়ালমারীতে এসেছে তারা।
ফরিদপুর অঞ্চল পেঁয়াজ, ধান ও পাট চাষের জন্য বিখ্যাত হওয়ায় এখানে শ্রমিকদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। রেলওয়ে স্টেশন ও হেলিপ্যাডে প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে শত শত শ্রমিক নিজেদের শ্রম বিক্রির জন্য অপেক্ষা করেন।
ধান ও পাট মৌসুমে দেশের উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, নওঁগা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী জেলা মাগুরা, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া থেকে বিপুল সংখ্যক নিম্নআয়ের মানুষ কাজের সন্ধ্যানে বোয়ালমারীতে ছুটে আসেন। সারাদিন কাজ শেষে স্বল্প মূল্যের বিভিন্ন মেস বা রেলওয়ে স্টেশনের প্লাটফর্মে রাত্রিযাপন করেন তারা।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাজের ধরন ও শ্রমের পরিমাণ অনুযায়ী বর্তমানে একজন শ্রমিক দিনে প্রায় ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। সাথে গৃহস্থ পরিবার শ্রমিকদের দুই বেলা খাবারও দিয়ে থাকে। ফলে শুধু মজুরি নয়, খাবারের ব্যবস্থাও শ্রমিকদের কাছে কাজের আকর্ষণ বাড়ায়।
পাট ও ধানের মৌসুমে কয়েক মাস এভাবেই এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ঘুরে কাজ করে সংসার চালান তারা। তবে কখনো কখনো কাজ না পেয়ে অনেক শ্রমিক খালি হাতে স্টেশনে ফিরে যায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় বোয়ালমারীর গ্রামাঞ্চলে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর সদস্যরাই নিজেদের জমির পাশাপাশি অন্যের জমিতেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। সময়ের সঙ্গে শিক্ষা, ব্যবসা, চাকরি, বিদেশগমনসহ নানা কারণে স্থানীয় মানুষের একটি বড় অংশ কৃষিশ্রম থেকে সরে গেছেন। ফলে কৃষি উৎপাদন বাড়লেও মাঠে কাজ করার মতো স্থানীয় শ্রমিকের সংকট তৈরি হয়েছে।
বোয়ালমারী রেলওয়ে স্টেশনে থাকা রাজশাহীর দিনমজুর রফিকুল ইসল জানান, কাজের সন্ধানে তারা বোয়ালমারীতে এসেছেন। কাজের ধরন অনুযায়ী তারা প্রতিদিন ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। কৃষিকাজের মৌসুমে এখানে কাজের চাহিদা থাকায় দূরবর্তী এলাকা থেকেও শ্রমিকরা আসেন বলে জানান তিনি।
চাপাইনবাবগঞ্জের দিনমজুর শাহিন হোসেন বলেন, রাজশাহীতে ধান লাগানোর কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা বোয়ালমারীতে এসেছেন। এখানে কখনো সন্ধ্যায়, আবার কখনো ভোরে শ্রমিক হিসেবে বিক্রি হন তারা। কাজের জন্য এসে কেউ কেউ স্টেশনের আশপাশে মেস বা বাসা ভাড়া করে থাকেন। এতে জনপ্রতি প্রতিদিন প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হয়।
নওগাঁ থেকে আসা দিনমজুর রবিউল শেখ বলেন, আগের তুলনায় কাজের পরিমাণ কমেছে, অথচ দিনমজুরের সংখ্যা বেড়েছে। গৃহস্থের বাড়িতে কাজ করলে অনেক সময় দুই বেলা খাবার দেওয়া হয় এবং বিকেলে কাজ শেষে মজুরি পরিশোধ করা হয়। থাকার জন্য কেউ কেউ স্বল্প খরচে মেসে থাকেন, আবার অনেকেই স্টেশনের প্লাটফর্মে রাত কাটান।
ধান লাগানোর জন্য শ্রমিক নিতে আসা স্থানীয় কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, পাট ও ধানের মৌসুমে স্থানীয় দিনমজুরের সংকট দেখা দেয়। তখন আমরা এই ‘শ্রমিকের হাট’ থেকে কাজের ধরণ অনুযায়ী দৈনিক ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা টাকা চুক্তিতে দিনমজুর নিয়ে যাই।
ভোরের আকাশ/ইউএম