ফেনী
টাটকা খেজুর রসের স্বাদ নিতে ছুটে আসেন রসপ্রেমীরা

ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার দক্ষিণ চর দরবেশ আদর্শ গ্রামে শীতের কুয়াশা ভেদ করে সূর্য ওঠার আগেই শুরু হয় কর্মচাঞ্চল্য। ভোরের আলো ফুটতেই খেজুরের তাজা রস খেতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন রসপ্রেমীরা। কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ ভ্যানে, আবার কেউ পায়ে হেঁটে এসে ভিড় জমান খেজুর বাগানগুলোতে। স্থানীয়দের ভাষ্য, শীত এলেই এ এলাকা পরিণত হয় খেজুরের রসের এক প্রাণবন্ত ব্যবসায়িক কেন্দ্রে। প্রতিদিন শত শত মানুষ তাজা রস পান করার পাশাপাশি বোতল ভরে বাসার জন্য নিয়ে যান।
স্থানীয় রস ব্যবসায়ী ও খেজুর বাগানের মালিক মো. দুলাল জানান, তিনি প্রায় ৩০০টি খেজুর গাছ লিজ নিয়ে রস সংগ্রহ করেন। প্রতিদিন এসব গাছ থেকে সংগৃহীত রস বিক্রি করে তার বিক্রির পরিমাণ থাকে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে দৈনিক লাভ হয় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তিনি বলেন, আমি অনলাইনে অর্ডার নিয়ে ফেনী শহরসহ বিভিন্ন স্থানে রস ডেলিভারি দেই। প্রতি লিটার রস ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করি। পাশাপাশি নিজের হাতে তৈরি খাঁটি রাবও বিক্রি করি, যার কেজি ৪০০ টাকা। রসের মৌসুমে আয় ভালো হয়।
আরেক রস ব্যবসায়ী মো. নাছির জানান, তার প্রায় ৬০টি খেজুর গাছ রয়েছে। এসব গাছ থেকে প্রতিদিন তিনি ৫ থেকে ৭ হাজার টাকার রস বিক্রি করেন। রাব বিক্রি করেন কেজি প্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দরে। তিনি বলেন, শীতকাল আমাদের জন্য বড় ভরসার সময়। এ সময়ে রস আর রাব বিক্রি করেই সংসারের ভালো সাপোর্ট পাই। স্থানীয় যুবক সাদ্দাম হোসেন জানান, তার প্রায় ১০০টি খেজুর গাছ রয়েছে। প্রতিদিন প্রায় ১০ হাজার টাকার মতো রস বিক্রি হয়। তিনি বলেন, ভোর হলেই মানুষ ভিড় করে। কেউ এখানেই রস খায়, কেউ আবার বাসার জন্য নিয়ে যায়। এখন পুরো এলাকাটাই একটা ব্যবসায়িক কেন্দ্র হয়ে গেছে। রস খেতে আসা দর্শনার্থীদের মধ্যেও দেখা যায় ব্যাপক উচ্ছ্বাস।
ফেনী শহর থেকে আসা নাইম বলেন, রাত তিনটায় বের হয়েছি শুধু তাজা রস খাওয়ার জন্য। এই রসের স্বাদ অন্য কোথাও পাই না। ছাগলনাইয়া থেকে আসা মানিক বলেন, শীত এলেই এখানে আসা নিয়ম হয়ে গেছে। কুয়াশার মধ্যে গরম রস খাওয়ার আনন্দটাই আলাদা। ফুলগাজী থেকে আসা রাজিব জানান, বন্ধুদের নিয়ে ভোরে আসি। এখানকার রস একেবারে খাঁটি তাই কষ্ট হলেও চলে আসি। ফেনী সদর থেকে আসা রাহুল বলেন, অনেক দূর থেকে এসেছি। রস খেয়ে আবার বাসার জন্যও নিয়ে যাচ্ছি।
স্থানীয়রা জানান, খেজুরের রসকে কেন্দ্র করে এখানে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক যুবক রস ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে রস সংগ্রহ করে অনলাইনে বিক্রি করছেন। এতে শীত মৌসুমে তাদের আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, শীতের কুয়াশাভেজা সকালে খেজুরের রসের সুবাসে মুখর দক্ষিণ চর দরবেশ আদর্শ গ্রাম। প্রকৃতি, ঐতিহ্য আর মানুষের পরিশ্রমের মেলবন্ধনে এই জনপদ এখন রসপ্রেমীদের এক জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
ভোরের আকাশ/র.ই