বালুঘাট বন্ধে সাংবাদিকের কাছে পদ্ধতি জানতে চাইলেন জেলা প্রশাসক

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া ও রানাখড়িয়া সবজিপাড়া (সরদার ঘাট)সহ পদ্মা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন ও সরকারি ইজারা ছাড়াই দিন-রাত চলছে অবাধে বালু উত্তোলন। একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও সশস্ত্র মহলের ছত্রছায়ায় প্রতিদিন কোটি টাকার সরকারি সম্পদ লুট হলেও স্থানীয় প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় নদীপারের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জেলার মিরপুরের তালবাড়িয়া ও রানাখড়িয়া ছাড়াও শিলাইদহ ঘাটে, তারাপুর, হরিপুর এবং কুমারখালীর সদকীতে অবৈধভাবে বালু তুলে নেওয়া হচ্ছে। নামমাত্র কিছু লোকদেখানো অভিযানের মধ্য দিয়ে এই অবৈধ বাণিজ্য ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অভিযান পরিচালনা করা হলে শুধু গরিব দিনমজুর ও শ্রমিকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, অথচ মূল হোতারা আগেই খবর পেয়ে নিরাপদ দূরত্বে সরে পড়েন। বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত কোটি টাকার জলযান বা নৌকা জব্দ না করে নামমাত্র (৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা) জরিমানা আদায় করে কিছু শ্রমিককে আটক করা হয়, ফলে মূল সিন্ডিকেট থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই বালু কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
মিরপুর উপজেলার তালবাড়িয়া ইউনিয়নের দুটি স্পটে চলছে এই রমরমা অবৈধ বাণিজ্য। তালবাড়িয়া ঘাটে অবৈধ বালু উত্তোলনের মূল হোতা হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার কাকন, রকি, মোস্তাক, ওয়াহিদ কবিরাজ, সাইফুল কবিরাজ, রেজন মণ্ডল, শামীম সদ্দার, রাজা কবিরাজ, মিঠু চেয়ারম্যান, হান্নান চেয়ারম্যান, তালবাড়িয়া ইউনিয়ন যুবদল নেতা ইকবাল হোসেন এবং তালবাড়িয়া ইউনিয়ন যুবলীগ নেতা জেমের নাম উঠে এসেছে।
এছাড়া আলীর নৌকা, রোকন, আমিরুল, সুজন, মেজবার ও হানিফসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নৌকার মাধ্যমে প্রতিদিন বালু তোলা হয়। প্রতিটি নৌকা থেকে প্রায় ৫০ হাজার টাকার বালু উত্তোলন করা হয়। প্রতিদিন শত শত নৌকায় নদী পথ থেকে বালু উত্তোলন হচ্ছে। রানাখড়িয়া সবজিপাড়া (সরদার ঘাট) থেকেও প্রতিদিন রাতের আঁধারে একইভাবে বালু উত্তোলন চলছে।
অভিযোগের বিষয়ে শামীম সরদারের সাথে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, প্রতিদিন তুলছি না, মাঝে মাঝে তুলছি, আমার নৌকা এখন ভাড়ায় খাটছে। মোস্তাকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন আপনাকে আমার নাম কে বলল সেটা আগে বলুন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও পরিবেশের মারাত্মক হুমকি অপরিকল্পিত ও অবৈধ এই বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। প্রতি বছর কুষ্টিয়া, পাবনা ও ফরিদপুরের মতো নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে শত শত হেক্টর ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। আইন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, সেতু, বাঁধ বা কালভার্টের আশপাশ থেকে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও প্রভাবশালী চক্র তা মানছে না।
ভাঙন রোধ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইতিমধ্যে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. গোলাম রহমান ভূঁইয়া সড়ক পরিবহন ও সেতু সচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিবসহ ১৯ জনের কাছে এই নোটিশ পাঠান। তিনি বলেন, নিয়ম অমান্য করে প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান বলেন, আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট করেছি ও পুলিশকে জানিয়েছি, এরপরে আর কি করার আছে বলেন, নতুন কোনো পদ্ধতি জানা থাকলে বলেন আমরা জানাচ্ছি। আপনারা সুনির্দিষ্ট তথ্য জানালে আমরা আবারও আইনগত ব্যবস্থা নেব।
অবিলম্বে মিরপুরের তালবাড়িয়া, রানাখড়িয়া, শিলাইদহ ঘাটে, তারাপুর, হরিপুর পদ্মাতে ও কুমারখালীর সদকী, কুমারখালী চাপড়া গড়াই ভাটায় সহ সকল অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে এর সাথে জড়িত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক ও নদীপারের আতঙ্কিত মানুষ।
ভোরের আকাশ/ এনউব