সিংগাইরে ভূমি অফিসের নায়েবের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ

মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার সায়েস্তা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে নামজারি (খারিজ) ও ভূমি উন্নয়ন কর দিতে গিয়ে ঘুষ, হয়রানি ও অসদাচরণের অভিযোগ উঠেছে ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) মো. ফরিদ হোসেনের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ঘুষ ছাড়া এ অফিসে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন। টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়। অন্যদিকে, মোটা অঙ্কের টাকা দিলে কাগজপত্রে ত্রুটি থাকলেও দ্রুত নামজারি করে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই ভূমি অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। নায়েবের সঙ্গে সখ্যতার কারণে দালালদের মাধ্যমে আসা আবেদনগুলো অগ্রাধিকার পায়। এমনকি একই জমি একাধিক ব্যক্তির নামে নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এতে সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
একাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নামজারির জন্য আবেদন করলে বিভিন্ন অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। চাহিদামতো টাকা না দিলে কাগজপত্রে ত্রুটি দেখিয়ে দিনের পর দিন ঘোরানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, নায়েব ফরিদ হোসেন অফিসের দুটি কক্ষ ব্যবহার করেন। এর মধ্যে একটি কক্ষের দরজা বন্ধ করে ঘুষের টাকা লেনদেন করা হয়। এ সময় অন্য সেবাপ্রার্থীদের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। ঘুষের টাকার একটি অংশ উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মকর্তাদের দিতে হয় বলেও আবেদনকারীদের কাছে দাবি করেন তিনি।
বৈরাগিরটেক গ্রামের মোসলেম উদ্দিন নামের এক বৃদ্ধ জানান, জমির নামজারি করতে দীর্ঘদিন ফরিদ নায়েবের কাছে ঘুরেও কাজ হয়নি। পরে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তদবির করে নামজারি সম্পন্ন করেন। এর আগে ভূমি উন্নয়ন কর দিতে গেলে তার কাছে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে খাজনার রেজিস্টার যাচাই করে জানতে পারেন, তার করের পরিমাণ মাত্র ১০০ টাকা। ওই টাকা জমা দিয়েই রশিদ সংগ্রহ করেন তিনি।
শ্যামনগর গ্রামের রেবেকা বলেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে জমির নামজারির জন্য এক মাস ধরে ভূমি অফিসে ঘুরছেন তিনি। প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র জমা দিলেও এখনো নামজারি সম্পন্ন হয়নি।
লক্ষ্মীপুর গ্রামের জামাল অভিযোগ করেন, পূর্ব সাহাপুর মৌজায় ২৩ শতাংশ জমি নামজারির জন্য আট মাস আগে ফরিদ হোসেনকে ৪৫ হাজার টাকা দেন তিনি। নামজারি সম্পন্ন হওয়ার পর ভূমি অফিসের ভলিউমে নিজের নামে জমির কোনো তথ্য পাননি। বরং একই জমি বালিয়াডাঙ্গীর সাদেকুল ইসলামের নামে নামজারি করা হয়েছে বলে জানতে পারেন। জামালের দাবি, জমির কাগজপত্রে কোনো ভুল ছিল না এবং জমিটি তার দখলে রয়েছে। বিষয়টি নায়েবকে জানালে সংশোধনের আশ্বাস দিলেও এখনো তাকে ঘোরানো হচ্ছে।
চন্দননগর গ্রামের কামাল হোসেন বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সায়েস্তা মৌজার একটি জমির নামজারির আবেদন করেন তিনি। কিন্তু এখনো ফাইল আটকে রয়েছে। তার দাবি, কাগজপত্র ঠিক থাকলেও ঘুষ না দেওয়ায় কাজ হচ্ছে না। অথচ ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্রের ক্ষেত্রেও মোটা অঙ্কের টাকা দিলে দ্রুত নামজারি করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট দালালচক্র কাজ করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কামাল আরও জানান, একই মৌজার ঋষিবাড়ি গ্রামের দিনেশ নামের এক ব্যক্তি জমির নামজারির কাজ দেখভালের দায়িত্ব তাকে দিয়েছিলেন। দিনেশের বাবাকে নিয়ে কয়েকবার ভূমি অফিসে গিয়েও হয়রানির শিকার হন। তার অভিযোগ, নামজারির জন্য ফরিদ হোসেন তার কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। ওই টাকা না দেওয়ায় ফাইলটি এখনো আটকে রয়েছে।
পূর্ব লক্ষ্মীপুর মৌজার বাসিন্দা মবজেল জানান, লক্ষ্মীপুরের একটি জমির নামজারি করে দেওয়ার কথা বলে নায়েব ফরিদের সাবেক অফিস সহকারী শিবনাথ তার কাছ থেকে ৩৫ হাজার টাকা নেন। বিষয়টি ফরিদও জানতেন বলে দাবি তার। নামজারি সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিপক্ষকে আবার মিসকেস করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এতে জমিটি নিয়ে নতুন করে বিরোধ সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কানাইনগর গ্রামের এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তার মায়ের নামে জমির নামজারি করতে নায়েব ফরিদ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে শুধু ওয়ারিশ সনদ বাকি ছিল। ২০ হাজার টাকা দিলে আর কোনো কাগজ লাগবে না, ওয়ারিশ সনদ তিনি নিজেই তৈরি করে নেবেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা। পরে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই কোনো শুনানি ছাড়াই নামজারি সম্পন্ন করে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
ওই ব্যক্তি আরও জানান, বেগুনটিউরি গ্রামের তার এক খালা ভূমি অফিসে হয়রানি এড়াতে এক দালালের মাধ্যমে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে জমির নামজারি করিয়ে নেন।
মোসলেবাদ গ্রামের ফকর উদ্দিন বলেন, তার একটি জমির নামজারি ও জমাভাগের জন্য নায়েব ফরিদ হোসেন দেড় লাখ টাকা দাবি করেন। পরে তিনি ১০ হাজার টাকা দেন। বাকি টাকা দেওয়ার আগেই নিজে উপজেলা ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে নামজারি সম্পন্ন করেন।
ভুক্তভোগীদের অনেকেই টাকা দেওয়ার পরও প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে চান না। জমি নিয়ে নতুন করে হয়রানি বা বিরোধে জড়ানোর আশঙ্কায় তারা মুখ খুলতে ভয় পান। তাদের দাবি, দালালদের মাধ্যমে আসা কাজ দ্রুত সম্পন্ন হলেও সাধারণ সেবাপ্রার্থীদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। এসব অভিযোগ তদন্ত করে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো. ফরিদ হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে নামজারিতে টাকা গ্রহণ, ঘুষ লেনদেনের জন্য আলাদা কক্ষ ব্যবহার এবং দালালদের সঙ্গে সখ্যতাসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। এ সময় তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এ বিষয়ে সিংগাইর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আল-আমিন কবির বলেন, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুন্নাহার বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। সংবাদকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোরের আকাশ/রই