হাওরে দুই বছর ধরে এক শিক্ষকেই চলছে পাঠদান

গত দুই বছর ধরে এক শিক্ষক দিয়েই পাঠদান কার্যক্রম চলছে, হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের দুর্গম উপজেলা তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের দুর্লভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি।
ফলে অনুন্নত, অবহেলিত, শিক্ষাধিক্ষাসহ নাগরিক নানা সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত হাওরপাড়ের প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন পিছিয়ে পড়ছে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয় থেকে বিদ্যালয়টিতে পরিদর্শনে যেতে হলে, হাওরের বিস্তীর্ণ জল এবং উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিতে হয়।স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্গম হাওরে বিদ্যালয়টির অবস্থান হওয়ায়, শিক্ষা কর্মকর্তাদের বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়টিতে পরিদর্শনে আসতে দেখেন নি তেমন একটা।
হাওরপাড়ের এই বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থী রয়েছে, ১ শত ৯ জন। বিদ্যালয়ের একমাত্র সহকারি শিক্ষক আব্দুল হান্নান তিনিই বিদ্যালয় খোলা, বন্ধ করা, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং নামানোর কাজ তো করছেনই একই সাথে, উপজেলাতে মাসিক সমন্বয় সভাতেও উপস্থিত থাকছেন তিনি।
দুর্গম হাওরের এই উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের একমাত্র অন্তরায় হলো, অনুন্নত এবং দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থা। তবে এরকম ভঙ্গুর অবস্থাতেই গত কয়েক যুগ ধরে এভাবেই চলছে তাহিরপুর উপজেলার শিক্ষা ব্যবস্থা।
দুর্লভপুর গ্রামের বাসিন্দা ফখরুল ইসলাম বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই অনেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসেন। কিন্তু বিদ্যালয়গুলো দুর্গম হাওর এলাকায় হওয়ায়, বিদ্যালয় পরিদর্শনের তালিকায় কখনোই দুর্লভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে রাখা হয় না। ফলে বিদ্যালয়টির এই করুন অবস্থা।
একই গ্রামের ফারুক মিয়া বলেন, উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিদ্যালয়ে পরিদর্শনে আসলে, বিদ্যালয়টির শিক্ষক সংকটের বিষয়টি অবশ্যই সমাধান করে দিতেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য শফিক মিয়া বলেন, বর্ষায় মৌসুমে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি বাঁশের সাঁকো পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করে। ২২ ফুট লম্বা এই সাঁকোর স্থলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি ফুটব্রিজ কিংবা পন্টুনব্রিজ নির্মাণ করে দিতেন তাহলে, শিক্ষার্থীরা নিরাপদে বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া করতে পারতো।
বিদ্যালয়টির একমাত্র সহকারি শিক্ষক আব্দুল হান্নান বলেন, আমার বাড়ি দুর্লভপুর গ্রামে হওয়ায়, অনেক ত্যাগতিতিক্ষা মেনে নেই করেই বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। বিদ্যালয়ের অন্যান্য যাবতীয় কার্যাদি ছাড়াও বেতন উঠানো ও মাসিক সমন্বয় সভাতে আমাকেই উপজেলায় যেতে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে, বাধ্য হয়েই নিজ বেতনের টাকা থেকে মাসিক ৩ হাজার টাকা বেতন দিয়ে একজন প্যারা শিক্ষক (খন্ডকালীন) নিয়োগ দিয়েছি। তিনি আরও বলেন, আমার চাকুরি ২০২৫ সালের ২৫ মে থেকে শুরু, তখন থেকেই আমি বিদ্যালয়টিতে একাই পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরওয়ার লিটন বলেন, তাহিরপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে, প্রাথমিক শিক্ষার ৭টি ক্লাস্টার থাকা প্রয়োজন কিন্তু ৭ ইউনিয়নে ক্লাস্টার রয়েছে মাত্র ৫টি । প্রতিটি ক্লাস্টারে ১জন করে উপজেলা সহকারি শিক্ষা কর্মকর্তা থাকার কথা থাকলেও ৫টি ক্লাস্টার পরিচালনায় রয়েছেন, মাত্র ১জন সহকারি শিক্ষা কর্মকর্তা।
জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রাজন কুমার সাহা বলেন, তাহিরপুর উপজেলায় ১ শিক্ষক দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম শুধু দুর্লভপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই নয়। এ সমস্যা পার্শ্বর্বর্তী শরিফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
শিক্ষক সংকট নিরসনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সম্প্রতি নিয়োগ হওয়া সহকারি শিক্ষকদের দুই মাস প্রশিক্ষণ শেষে ১ জন শিক্ষক দিয়ে যে বিদ্যালগুলোর পাঠদান কার্যক্রম চলছে, সেই বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক পদায়ন করার জন্য, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মহোদয়কে জানানো হবে।
ভোরের আকাশ/রই