শেরপুরে গ্রাম আদালতে বাড়ছে মানুষের আস্থা

ছোটখাটো বিরোধ মীমাংসায় বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে গ্রাম আদালত। জমিজমা নিয়ে বিরোধ, পাওনা টাকা আদায়, পারিবারিক কলহ কিংবা সামান্য মারধরের মতো ঘটনায় এখন আর দূরের আদালতে ছুটতে হচ্ছে না স্থানীয়দের। ইউনিয়ন পরিষদেই দ্রুত ও স্বল্প খরচে এসব বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পাওয়ায় গ্রাম আদালতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও বাড়ছে।
ইউনিয়নের এখতিয়ারাধীন এলাকায় সংঘটিত নির্দিষ্ট কিছু ফৌজদারি ও দেওয়ানি বিরোধ স্থানীয়ভাবে নিষ্পত্তির জন্য ইউনিয়ন পরিষদে যে আদালত গঠন করা হয়, সেটিই গ্রাম আদালত। স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করা, বিশেষ করে নারী, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা এবং উচ্চ আদালতে মামলার চাপ কমানোই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
শেরপুর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন পরিষদে প্রতি মঙ্গলবার গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব আদালতে স্থানীয় বিভিন্ন বিরোধের শুনানি নেওয়া হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ছোটখাটো বিরোধ দ্রুত মীমাংসা হওয়ায় সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। পাশাপাশি বিরোধ বড় আকার ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও কমছে।
গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে কাজ করছেন শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইদুজ্জামান হিমু। এরই মধ্যে তিনি ভবানীপুর, গাড়িদহ ও খামারকান্দী ইউনিয়ন পরিষদ পরিদর্শন করে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছেন। পাশাপাশি সেবার মান বাড়ানো ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রাম আদালতের সুফল পৌঁছে দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাধিকবার মতবিনিময় করেছেন ইউএনও। গ্রাম আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষকে জানাতে প্যানা, ব্যানার ও সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে প্রচার-প্রচারণাও জোরদার করা হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যানার-প্যানা স্থাপন এবং মাইকিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা গেছে।
শেরপুর উপজেলার ১ নম্বর কুসুম্বী ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ১৪ বছর ধরে চলা একটি জমি-সংক্রান্ত বিরোধের শুনানি হয়েছে গ্রাম আদালতে। বাদী জমিটি কিনলেও দীর্ঘদিন ধরে দখলে যেতে পারছিলেন না। উভয় পক্ষের বক্তব্য ও দীর্ঘ শুনানি শেষে গ্রাম আদালত বিষয়টির রায় দেন।
দীর্ঘ ১৪ বছর পর বিরোধের নিষ্পত্তি হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাদী খোকা মোল্লা। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে ভোগান্তিতে ছিলাম। গ্রাম আদালতের মাধ্যমে এর সমাধান হওয়ায় স্বস্তি পেয়েছি।’
কুসুম্বী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম পান্না বলেন, ‘জমিটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রায় ১৪ বছর ধরে বিরোধ চলছিল। গ্রাম আদালতের মাধ্যমে শুনানি শেষে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।’
শুধু কুসুম্বী ইউনিয়ন নয়, গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সুবিধা পাচ্ছেন ২ নম্বর গাড়িদহ ইউনিয়নের বাসিন্দারাও। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাও. মো. তবিবুর রহমান বলেন, গ্রাম আদালতের সুফল সম্পর্কে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়েছে। চলতি বছর এ ইউনিয়নে ২৯টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বগুড়া জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে জেলার ১০৯টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের সহকারী জজের মাধ্যমে গ্রাম আদালত পরিচালনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইউপি চেয়ারম্যানসহ পাঁচ সদস্যের একটি বেঞ্চ গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করে। চেয়ারম্যানের সঙ্গে থাকেন দুইজন ইউপি সদস্য এবং বাদী-বিবাদী উভয় পক্ষের মনোনীত দুইজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনা, স্থানীয়ভাবে তথ্য যাচাই-বাছাই এবং ঘটনার বাস্তবতা পর্যালোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়।
শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইদুজ্জামান হিমু বলেন, গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ খুব সহজে ও অল্প খরচে ছোটখাটো বিরোধের সমাধান পেয়ে থাকেন। এ বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন করা হচ্ছে, যাতে তারা অর্থ ও সময় দুটোই সাশ্রয় করতে পারেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদেই নিরপেক্ষভাবে বিরোধের সমাধান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তিনি জানান, গত আগস্ট মাসে পুরো উপজেলায় মোট ৮৮টি মামলা দায়ের হয়েছিল। এর মধ্যে ৪৮টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা