গাইবান্ধার বল্লমঝাড় ইউনিয়নকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা

বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি। এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু একটি পরিবারে সীমাবদ্ধ থাকে না; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন ও সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নেও এর প্রভাব পড়ে। বাল্যবিবাহের কারণে অনেক কিশোরীর শিক্ষাজীবন থেমে যায় এবং অপরিণত বয়সে মাতৃত্বের ঝুঁকি তৈরি হয়। এমন বাস্তবতায় সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়ে গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) দুপুরে বল্লমঝাড় ইউনিয়ন পরিষদ হলরুমে এ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বল্লমঝাড় ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, পরিবর্তন চেঞ্জ প্রজেক্ট ও গাইবান্ধা এডিপির সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বল্লমঝাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইউপি সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান পলাশ।
এ সময় ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ পরিবর্তন প্রজেক্টের প্রকল্প কর্মকর্তা রেখা খাতুনসহ সংস্থাটির গাইবান্ধা এরিয়া অফিসের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান ও সহকারী শিক্ষক, ইমাম, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, সুধীসমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান বলেন, বল্লমঝাড় ইউনিয়নকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করা হলেও এ অর্জন ধরে রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। ইউনিয়নে কোনোভাবেই বাল্যবিবাহ হতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।
তিনি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তাহীনতা, অসচেতনতা ও পারিবারিক নানা চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে। এর ফলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়ে এবং কিশোরীদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। অপরিণত বয়সে বিয়ের কারণে নানা পারিবারিক ও সামাজিক জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
বক্তারা আরও বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ শুধু প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও সমাজের সচেতন মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। কোথাও বাল্যবিবাহের আয়োজন হলে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
তাঁরা বলেন, একটি মেয়েকে বিয়ের বয়সের আগে বিয়ে না দিয়ে শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে হবে। শিশুর নিরাপদ শৈশব ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হলে সুস্থ ও উন্নত সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিশু সুরক্ষা, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম, শিশু নির্যাতন, পাচার ও অবহেলা প্রতিরোধে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
আলোচনা সভা শেষে বল্লমঝাড় ইউনিয়নকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করে আনুষ্ঠানিকভাবে ফলক উন্মোচন করা হয়। এ সময় উপস্থিত সবাই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করার অঙ্গীকার করেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু ঘোষণা নয়, নিয়মিত নজরদারি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বল্লমঝাড় ইউনিয়নকে দীর্ঘমেয়াদে বাল্যবিবাহমুক্ত রাখা সম্ভব হবে।
ভোরের আকাশ/জেআ