শাকিল হত্যা মামলায় ৩ দিনের রিমান্ডে এমপিপুত্র মিন্টু

নাটোরের গুরুদাসপুরে ছাত্রদল নেতা শাকিলকে (৩২) হত্যায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুর ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন গুরুদাসপুর আমলী আদালত। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেল ৫ টার দিকে তাকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত ওই আদেশ দেন।
হত্যা মামলার রিমান্ড প্রাপ্ত আসামি হলেও আদালত থেকে বের করার সময় এমপিপুত্র মিন্টুর হাতে হাতকড়া পড়ায়নি পুলিশ। পরে তাকে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালত থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিব) হেফাজতে নেওয়া হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করে কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক আসমাউল হক বলেন, হত্যা মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামির বিরুদ্ধে দশ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষের আদালত আসামি মিন্টুর তিন দিনের রিমান্ড মনজুর করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বরাত দিয়ে নাটোর জজ কোর্টের আইনজীবী মুক্তার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে আসামীর পক্ষের কোন আইনজীবী ছিলেন না। তবে আসামি নিজেই শুনানি করার জন্য আদালতের কাছে অনুমতি চান। আদালত অনুমতি দিলে মিন্টু বলেন, তিনি এই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত নন। পুলিশ কোন কিছু যাচাই না করেই তাকে গ্রেফতার দেখিয়েছে। তিনি সঠিক তদন্ত চান। এ সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডটি চাঞ্চল্যকর। প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়ায় আসামির বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তি সাক্ষ্য দিতে সাহস পাচ্ছেন না। হত্যার সঠিক রহস্য উদঘাটনের জন্য আসামিকে ১০ দিনের রিমান্ড নেওয়া দরকার। এই সময় আদালত উভয় পক্ষের শুনানির পর আসামি মিন্টুর বিরুদ্ধে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এরআগে সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত দশটার দিকে গুরুদাসপুর বাজার সংলগ্ন ভাড়া বাড়ি থেকে মিন্টুকে আটক করে গুরুদাসপুর থানা পুলিশ।
পরে মঙ্গলবার দুপুরে তাকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। নুরুজ্জামান মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়কের পদে রয়েছেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ছাত্রদল নেতা শাকিল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সোমবার দিবাগত রাতে থানা পুলিশ মিন্টুকে আটক করে রাত ১২টার দিকে ডিবির কাছে হস্তান্তর করে। জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে মিন্টুকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে রিমান্ড মঞ্জুর করার পর আসামি মিন্টুকে আবারো ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
নিহত শাকিল ইসলাম গুরুদাসপুর পৌরসভার খামারনাচকৈড় খোয়ারপাড়া এলাকার রবিউল করিমের ছেলে। তিনি গুরুদাসপুর পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব ছিলেন। দুর্বৃত্তরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করেছিলেন। এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় অজ্ঞাত নামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি মামলা করেছিলেন তার বাবা রবিউল করিম। সেই মামলাতেই নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় থানায় জিডির পর ফেসবুক পোস্ট দেন শাকিল গত ২০ এপ্রিল ছাত্রদল নেতা শাকিল নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। ওই পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে। যারা আমাকে মারতে পারবে, তাদের নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে। এই বিষয়ে আমি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় একটা ডাইরি (সাধারণ ডায়েরি) করেছি এবং তাদের নাম উল্লেখ করা আছে। আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে এই ডায়েরি (জিডি) অনুযায়ী মামলা করে দেবেন।’
জীবদ্দশায় দেওয়া শাকিলের ওই ফেসবুক পোস্টের বিষয়ে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নজরুল ইসলাম কোন মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, সবকিছু চিন্তা করেই শাকিল হত্যার তদন্ত চলছে।
শাকিলের পিতা রবিউল ইসলাম বলেন, হুমকি পাওয়ার পর তার ছেলে থানায় জিডি দিয়েছিলেন। অথচ শাকিলকে রক্ষা করতে পারেনি পুলিশ। আবার খুন হওয়ার পরও অপরাধী ধরতে পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা ছিল। ছেলে হত্যার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান তিনি।
এমপির দুই ছেলের দুই গ্রুপ: স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টু গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদে আছেন। ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগ উপজেলা বিএনপি'র সাবেক সহসম্পাদক ছিলেন। এমপির দুই পুত্রের পৃথক দুটি গ্রুপ ও সমর্থক গোষ্ঠী রয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্বও আছে। নিহত ছাত্রদল নেতা শাকিল এমপির ছোট ছেলে মাহমুদুজ্জামান সোহাগের অনুসারী ছিলেন।
নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখার আহমেদ বলেন, চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির সঠিক তদন্ত করতে পুলিশের একাধিক কাজ করছে। অপরাধী যত বড় প্রভাবশালী হোক না কেন পুলিশ তাকে ছাড় দেবেনা।
শাকিলের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বিকেল তিনটায় রাজধানীর পল্টন এলাকায় বিএনপির দলীয় কার্যালয়ের সামনে নিহত শাকিলের প্রথম জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গুরুদাসপুর বিলচলন শহীদ শামসুজ্জোহা কলেজ মাঠে এশার নামাজের পর দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাকে চাঁচকৈড় পুড়ানপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হবে।
ভোরের আকাশ/ এনউব