ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বোয়ালিয়া খাল খনন শুরু

দেশব্যপী নদী, নালা, খাল, জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচি একযোগে উদ্বোধন ও বাস্তবায়ন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) কর্তৃক বাস্তবায়িত Bangladesh Sustainable Recovery, Emergency, Preparedness and Response Project (B-STRONG)- Agriculture System Restoration Component, BADC Part এর আওতায় জেলার বিজয়নগর উপজেলার বোয়ালিয়া খাল পুনঃখনন এর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
সোমবার (১৬ মার্চ) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, যারা নদী দখল করছে বা ময়লা-আবর্জনা ফেলে দূষণ করছে, তাদের দ্রুত উচ্ছেদ করে এগুলোকে সজীব করে তুলতে হবে। পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, খালগুলো ঠিক থাকলে নৌপথ হিসেবেও এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহানের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নান, পুলিশ সুপার শাহ মো. আব্দুর রউফ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি, জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আলী আজম, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান শাহীন প্রমুখ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১ আসনের সংসদ সদস্য এম. এ. হান্নান বলেন, আমাদের এ স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচির মধ্যে সব চাইতে জনপ্রিয় কর্মসূচি ছিল সেটা ছিল খাল খনন। সমগ্র বাংলাদেশকে শষ্য শ্যামল এবং কৃষি নির্ভর একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার জন্য শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান খাল খনন কর্মসূচি তৈরী করেছিলেন এবং সেই সময় এ খাল খনন কর্মসূচি ছিলো বাংলাদেশের সবচাইতে আলোচিত কর্মসূচি। তারই ধারাবাহিকতা আমাদের প্রিয় নেতা তারেক রহমান যখন লন্ডনে প্রবাসে ছিলেন সেখান থেকেই উনি ২০২৩ সালে ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছিলেন। ৩১ দফা কর্মসূচির একটি উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি এ খাল খনন কর্মসূচি। এ বাংলাদেশের কৃষি বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ৩ আসনের সংসদ সদস্য মোঃ খালেদ হোসেন মাহবুব বলেন, আমাদের সৌভাগ্য যে প্রথম ধাপে সারা বাংলাদেশে প্রধামন্ত্রী যে খাল খনন কর্মসূচি সে কর্মসূচি প্রথম ধাপে আজকে বোয়ালিয়া খালের উদ্বোধন করতে যাচ্ছি। সে জন্য আমি সংশ্লিষ্ট যারা বিএডিসিসহ মাননীয় জেলা প্রশাসক সবাইকে আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মসূচি না এটা ওনার পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়া রহমান সে সময় ১৯৭৮, ১৯৭৯ সনে এই খাল কাটা কর্মসূচি শুরু করেছেন। তখনকার সময় আমাদের অর্থনীতি ছিল কৃষি নির্ভর। তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি গারমেন্টস নির্ভর ও রেমিট্রেন্স নির্ভর ছিল না। কৃষি ছিলো এক মাত্র পথ। সে কথা বিবেচনা করে তৎকালিন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার রহমান সারা বাংলাদেশে খাল কাটা কর্মসূচি মাধ্যমে কৃষকদের সাবলম্বী করা জন্য খাল কাটা কর্মসূচি প্রচেষ্টা নেন। তারি ধারাবাহিকতায় ওনার সুযোগ্য সন্তান আজকের প্রধানমন্তী উপকারের জন্য কৃষকদের খাল কাটা কর্মসূচি নিয়েছেন। এই বোয়ালিয়া খালের খননের ফলে ১৪০ হেক্টর জমি পত্তন অঞ্চলের মানুষ উপকৃত হবে। আরেকটা অংশ আছে চর ইসলামপুর প্রায় ৪০০ হেক্টর জমি সেচে আওতায় এসেছে। গত বছর এই বোয়ালিয়া খালের চর ইসলামপুর অংশ খাল খনন করেছে এবং কৃষকগণ সুবিধা ভোগ করছে। আগামীতে এই বোয়ালিয়া খাল খননের মাধ্যেমে বিজয়নগের যে কৃষি জমি সে কৃষি জমিতে শুষ্ক মৌসুমে যাতে খালে পানি থাকে সে জন্য এই খাল খননের ব্যবস্থা করবেন মর্মে আশ্বস্থ করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদ এর প্রশাসক মো: সিরাজুল ইসলাম সিরাজ বলেন, সারা বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশে ৫৩টি জেলায় খাল খনন কর্মসূচির শুভ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের যাতে সেচ দিতে কোন সমস্যা না হয়, সে কারণে সারা বাংলাদেশের খালগুলিকে পুনঃজ্জিবিত করা হচ্ছে। তিনি তার বক্তব্যে খাল পুনঃখননের উপর গুরুত্বারোপ করেন।
পুলিশ সুপার বলেন, খাল খনন এর মাধ্যমে সারফেস ওয়াটার রিটেনশনের একটা ওয়ে। তিনি খাল খননের বিষয়ে কানেকটিভি যেন থাকে সে বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন। বোয়ালিয়া খাল খননে সাইট সিলেকশনে খুবই ভালো হয়েছে এবং এ খাল খনন কর্মসূচি সফল হবে।
খাল পুনঃখনন কাজ উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান বলেন, খাল পুনঃখনন একটি চমৎকার উদ্যোগ। তিনি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন খাল খনন ও পুনঃখনন এর একটি তালিকা প্রস্তুত করেছেন। তিনি বিএডিসিসহ সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান খাল খনন করে মর্মে উল্লেখ করেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার প্রস্তুতকৃত প্রায় ৪০০ টি খালের তালিকা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। খাল দখলদার উচ্ছেদ এর বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন। দেশটা সোনার বাংলা হোক এ প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
সভায় উপস্থিত বোয়ালিয়া খালের উপকারভোগী কৃষক/কৃষাণীবৃন্দ, বিভিন্ন সরকারী দপ্তরের কর্মকর্তাবৃন্দ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রতিনিধিগণ সহ সকলকেই বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়।
উদ্বোধীন অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মোঃ ওবায়েদ হোসেন, উপপ্রধান প্রকৌশলী (সেচ)-১, বিএডিসি, কৃষি ভবন, ঢাকা। তিনি বলেন, বিএডিসি একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যের যোগান এবং কৃষি খাতকে আধুনিকায়ন ও অধিক উৎপাদনমুখী করতে বিএডিসি’র ভূমিকা অনস্বীকার্য। বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আগামী ৫ বছরে ২০ হাজার কি.মি. খাল খনন/পূন:খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংস্থা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এর মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলায় পত্তন ও চর ইসলামপুর ইউনিয়নের বোয়ালিয়া খাল পুনঃখনন এর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
খালটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলাধীন চর ইসলামপুর ইউনিয়নের চররাজাবাড়ি, হাওয়াইখলা ও পত্তন ইউনিয়নের দৌলতবাড়ী মৌজার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পারেঙ্গাবাড়ী তিতাস হতে শুরু হয়ে বোয়ালিয়া বিল (তিতাসের শাখা খাল) পতিত হয়েছে। খালের মোট দৈর্ঘ্য ৬ কি.মি.। বিগত ২০২১-২২ অর্থ বছরে বিএডিসি বাস্তবায়িত কুমিল্লা-চাঁদপুর-ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সেচ এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প এর মাধ্যমে তিতাস নদী হতে বোয়ালিয়া ব্রীজ পর্যন্ত ৪ কি.মি. পুনঃখনন করা হয়েছে। আশেপাশের আজ এই বিস্তীর্ণ সবুজ ফসলি মাঠ খননকৃত খালের ভূ-পরিস্থ পানি দিয়ে সেচ প্রদানের মাধ্যমেই তৈরি। বিভিন্ন ক্ষমতাসম্পন্ন সেচযন্ত্র দিয়ে খালের আশেপাশের প্রায় ৪০০ হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। খালে বিএডিসি কর্তৃক ৪টি বিভিন্ন ক্ষমতা সম্পন্ন দক্ষ সেচ ব্যবস্থা সম্বলিত (ভূ-গর্ভস্থ ইউপিভিসি ব্যারিড পাইপ) বিদ্যুতায়িত এবং ২টি ডিজেল চালিত এলএলপি সেচযন্ত্র চালু রয়েছে। এছাড়াও খালটিতে ব্যক্তিগত আরও ৩০ টির অধিক ডিজেল চালিত সেচযন্ত্র চালু রয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ্য করেন, খালের অবশিষ্ট অংশ (বোয়ালিয়া ব্রীজ হতে বোয়ালিয়া বিল- ২ কি. মি. এবং শাখা খাল- ১.৩৮ কি. মি.) ৩.৩৮০ কি. মি অংশ দীর্ঘদিন যাবৎ পুনঃখনন না করার ফলে প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) কর্তৃক বাস্তবায়িত Bangladesh Sustainable Recovery, Emergency, Preparedness and Response Project (B-STRONG)- Agriculture System Restoration Component, BADC Part এর মাধ্যমে চলতি অর্থ বছরে ৩.৩৮০ কি. মি. খাল পুনঃখনন এর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। খালটি পুনঃখনন করা হলে প্রাকৃতিক জলাশয় সৃষ্টি হবে এবং খালে সেচযোগ্য ভূ-পরিস্থ পানি সহজলভ্য হবে এবং ভূ-পরিস্থ পানি নির্ভর সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত ও নিষ্কাশন ব্যবস্থা ত্বরান্বিত হবে।
খালটি পুনঃখনন করা হলে খালের আশেপাশের কৃষি জমিতে লো লিফট পাম্পের সাহায্যে সেচ মৌসুমে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সেচ প্রদান সহ খালের নাব্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং নৌ পথে ফসল কর্তনের পর মাঠ থেকে পরিবহন ও কৃষি উপকরন পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। উক্ত খাল পুনঃখনন কাজে স্থানীয় জনসাধারণ, উপকারভোগী কৃষক, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগীতা কামনা করেন।
বিএডিসি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী রনি সাহা জানান, আজকের খাল পুনঃখনন কাজ উদ্বোধনের সভাপতি, প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি, আমন্ত্রিত অতিথিগণ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধি ও অন্যান্য সহকর্মীবৃন্দ উপস্থিত হওয়ায় বিএডিসি এর পক্ষ থেকে থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
উপকারভোগী কৃষকদের পক্ষ থেকে একজন বলেন, কৃষি জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরণের পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু জোয়ারের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয়। জোয়ার আসলে পানি দিতে পারে না আসলে এক সপ্তাহ, দশ দিন বা পনের দিন জমিতে পানি নাও থাকতে পারে। এই খাল খনন করে দিলে জমিতে আর পানির সমস্যা হবে না মর্মে জানান। জমিতে সময়মত সেচ দিতে পারবে, ফসল ভালো হবে, উৎপাদনও ভালো হবে। যত খাল, বিল, গাং আছে সমস্ত কিছু খনন করার জন্য সরকার ও বিএডিসি’র কাছে আবেদন করেন।
ভোরের আকাশ/এসএইচ