হুমকিতে দেশী মাছ ও জলজ প্রাণী
বেড়ায় অবাধে তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে চায়না দুয়ারী জাল

পাবনার বেড়ায় অবাধে তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে চায়না দুয়ারী জাল,হুমকিতে দেশী মাছ ও জলজ প্রাণী।
বেড়া পৌরসভার বনগ্রাম এলাকার বেশ কিছু কারখানায় দিন-রাত তৈরি করা হচ্ছে চায়না দুয়ারী জাল। অন্যদিকে বেড়া বাজারে প্রকাশ্যে তা বিক্রি করা হচ্ছে। কারখানাগুলোতে তৈরি নিষিদ্ধ এসব জাল রাতের অন্ধকারে ট্রাক, পিকআপ ও বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বনগ্রাম এখন চায়না দুয়ারী জাল তৈরির প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সেখানকার কারখানাগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ জাল তৈরি হচ্ছে। প্রস্তুত শেষে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে ভ্যান, ট্রাক ও পিকআপে বোঝাই করে,কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিরাজগঞ্জ ও নাটোরসহ দেশের নানা জায়গায় এসব চালান পাঠানো হচ্ছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ,এই অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করতে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। পাবনার ফরিদপুর,বেড়া,সাঁথিয়া, সুজানগরসহ আশপাশের উপজেলা প্রশাসন ও মৎস্য অফিসের গেলো তিন বছরে চায়না দুয়ারী জাল বিরোধী অভিযানের চিত্র বলতে বাকি রাখে না যে। পাবনার এই সকল এলাকায় কি পরিমাণ চায়না দুয়ারী জাল তৈরি ও বিক্রি হচ্ছে। লোকচক্ষুর আড়ালে নিষিদ্ধ এ চায়না দুয়ারী জাল তৈরী ও বিক্রি করা হয়।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা, বেড়া পৌর এলাকার বেড়া বাজার, সওদাগর পাড়া,বনগ্রাম। মাশুমদিয়া ইউনিয়ন এর ত্রিমোহনী বাজার, রুপপুর ইউনিয়ন এর কাজিরহাট,বাঁধেরহাট। সাঁথিয়া উপজেলার দুলাউড়ী, সেলুন্দা। সুজানগর উপজেলার সাঁতবাড়ীয়া, রানীনগর, সাগরকান্দী, দুলাই, চব্বিশ মাইল এর সাধারণ জাল সুতার দোকানসহ অস্থায়ী গোডাউন এ মজুদ রেখে এই চায়না দুয়ারী বিক্রি হচ্ছে।
নিষিদ্ধ এ চায়না দুয়ারী সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে খয়রান বিলসহ আশপাশের খাল-বিল জলাশয়ে। চায়না দুয়ারী জাল পরিবেশের যে ব্যাপক ক্ষতি করে,তা এক কথায় ভয়াবহ। এটি জলাশয়ের জন্য একটি "নীরব ঘাতক" হিসেবে কাজ করে এবং জলজ পরিবেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে। চায়না দুয়ারী জাল জলজ প্রাণীর জন্য একটি সুনিশ্চিত মৃত্যুফাঁদ।
এটি জলাশয়ের তলদেশ ঘেঁষে পাতা হয় বলে মাটির কাছাকাছি থাকা কোনো জলজ প্রাণীই এর হাত থেকে রেহাই পায় না। কয়েক বছর আগেও পাবনার নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে বর্ষাকাল এলেই দেখা যেত দেশী মাছের সমারোহ।
গ্রামগঞ্জের হাট-বাজার সয়লাব থাকত কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, পুঁটি, মলা, বোয়াল, আইড়, শোল, গজার, চিতল, বাইম, খলিসাসহ নানা প্রজাতির মিঠাপানির মাছ। তবে সময়ের বির্বতনে চায়না দুয়ারী ও কারেন্ট জালের প্রভাবে এখন বর্ষার মৌসুমেও নদী ও বিল-জলাশয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে দেশী মাছ মিলছে না। ফলে বাজারে দেশী মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভোক্তাদের চাষের মাছের ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, উজানে বাঁধ নির্মাণ, খাল-বিল ভরাট, জলাশয় দূষণ, প্রজনন ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হওয়া, ডিম ছাড়ার আগেই মা মাছ আহরণ এবং কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারী, বেড় জাল ও মশারি জালের অবাধ ব্যবহারের কারণে দেশীয় মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, চায়না দুয়ারী ও কারেন্ট জাল সহ অন্যান্য কারণে ৫০টিরও বেশি দেশীয় প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কয়েক দশক আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় আড়াই শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তার উল্লেখযোগ্য অংশ বিরল হয়ে পড়েছে।
বিপরীতে বিদেশী ও হাইব্রিড প্রজাতির মাছের চাষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিলে কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, পুঁটি, মলা, বোয়াল, আইড়,শোল, গজার, চিতল,বাইম,খলিসাসহ প্রায় শতাধিক প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে চায়না দুয়ারী ও কারেন্ট জালের প্রভাবে এসব মাছও জলজ প্রাণী প্রায় অনুপস্থিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী-নালা, খাল-বিল ও প্লাবনভূমি পুনঃখনন, প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, অবৈধ জাল ব্যবহার বন্ধ এবং জলাশয় দখল ও দূষণ রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব আরো সঙ্কটের মুখে পড়বে। অনেকের দাবি চায়না দুয়ারী জাল এর বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বেড়া উপজেলা প্রশাসন জানান, কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারী জাল উৎপাদন, বিপনন ও বিক্রয়ের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। দেশীয় মাছ রক্ষায় আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ভোরের আকাশ/রই