জীবননগরে লাইসেন্স ছাড়াই চলছে অধিকাংশ জুয়েলারি ব্যবসা

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বছরের পর বছর ধরে লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়াই চলছে অধিকাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান। উপজেলা জুয়েলার্স সমিতির তথ্যমতে, উপজেলায় সমিতির অধীনে রয়েছে ১২৪টি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে মাত্র ৩৩টি প্রতিষ্ঠানের জেলা প্রশাসকের (ডিসি) ডিলিং লাইসেন্স রয়েছে। অর্থাৎ ৯১টি প্রতিষ্ঠানেরই নেই ডিসি ডিলিং লাইসেন্স।
এ ছাড়া হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স, ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স এবং টিআইএন (TIN) আইডি নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্স ছাড়াই একপ্রকার নিয়ম-নীতির বাইরে থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে স্বর্ণের ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
শুধু লাইসেন্সের বিষয়েই নয়, স্বর্ণ কেনাবেচার হিসাব সংরক্ষণ নিয়েও রয়েছে গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানেই স্বর্ণ কেনাবেচার ক্ষেত্রে ক্রেতাকে ভাউচার বা মেমো দেওয়া হয় না। একইভাবে নিয়মিতভাবে খাতায় কেনাবেচার হিসাব সংরক্ষণ করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে স্বর্ণের উৎস, কেনাবেচার পরিমাণ ও লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
জীবননগর বাজার, মকছুদ সুপার মার্কেট, পানবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় বিভিন্ন জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে স্বর্ণের অলংকার বিক্রি হচ্ছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও অনুমোদন সম্পর্কে জানতে চাইলে অনেক ব্যবসায়ী বিষয়টি এড়িয়ে যান।
জীবননগরের ফাতেমা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী ইউনুচ আলী বলেন, “আমার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই। আমি বছর দুয়েক আগে নতুন দোকান দিয়েছি। এতদিন লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা করেছি, কোনো সমস্যা হয়নি। এখন সমিতির মাধ্যমে লাইসেন্সের জন্য কাগজপত্র জমা দেওয়ার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।”
জীবননগর মকছুদ সুপার মার্কেটের নিউ জবা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী শ্রী সদানন্দ কর্মকার স্থানীয়ভাবে পাইকারি স্বর্ণ ব্যবসায়ী বা ‘মহাজন’ হিসেবে পরিচিত। তিনি বলেন, “আমরা এভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি, কোনো সমস্যা তো হয়নি।”
দোকানে কতটুকু স্বর্ণ সংরক্ষণ করা যায়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এমন কোনো নির্দিষ্ট নেই। যার যেমন সামর্থ্য আছে, সে তেমন সংরক্ষণ করতে পারে।”
তবে পানবাজারের দত্ত জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী শ্রী গৌর দত্ত বলেন, “আমার প্রতিষ্ঠানের সব লাইসেন্স আছে। তবে বাজারের অনেক দোকানের নেই। সেখানে খোঁজ নেন।”
জীবননগর উপজেলা জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি হাজী আশাবুল হক বলেন, “আমাদের সমিতির অধিকাংশ সদস্যের ডিসি লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্সসহ অন্য কোনো লাইসেন্স নেই। আমরা সমিতির পক্ষ থেকে তাদের বারবার মৌখিক ও লিখিত নোটিশ পাঠিয়েছি। কিন্তু তারা বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে না।”
ফায়ার নিরাপত্তার বিষয়টিও উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। জীবননগর ফায়ার সার্ভিসের ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর খালিদ হাসান বলেন, “জীবননগরের অধিকাংশ দোকানে ফায়ার লাইসেন্স নেই। আমরা বারবার তাদের তাগাদা ও সতর্ক করেছি। তবে তারা বিষয়টি সেভাবে আমলে নেয়নি।”
ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স না থাকা এবং স্বর্ণের কেনাবেচার হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের নজরদারি ও ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, স্বর্ণের মতো মূল্যবান ও সংবেদনশীল পণ্যের ব্যবসায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বৈধ কাগজপত্র, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কেনাবেচার হিসাব সংরক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) বি. এম. তারিক-উজ-জামান বলেন, “চুয়াডাঙ্গা জেলাব্যাপী জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হচ্ছে। ডাটাবেজ তৈরির কাজ শেষ হলে তালিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, জুয়েলারি ব্যবসার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও মূল্যবান ধাতু জড়িত থাকায় এ খাতে নিয়মিত নজরদারি, বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিতকরণ এবং লেনদেনের স্বচ্ছ হিসাব সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের ডাটাবেজ তৈরির পর জীবননগরের কোন কোন প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় লাইসেন্স রয়েছে এবং কারা লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছে, তা স্পষ্ট হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
ভোরের আকাশ/ এনউব