কেচির ক্যাচ ক্যাচ শব্দে চলে অতুল শীলের সংসার

যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার অনেক পুরোনো পেশা ও ঐতিহ্য। আধুনিক সেলুন, নান্দনিক সাজসজ্জা আর নানা ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতির ভিড়ে আগের সেই ভ্রাম্যমাণ নরসুন্দরদের দেখা এখন অনেকটাই কমে গেছে।
তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আজও কাঁচি-চিরুনি হাতে মানুষের চুল কেটে জীবিকা নির্বাহ করছেন কেউ কেউ।
তেমনি একজন পিরোজপুর সদর উপজেলার শিকদারমল্লিক গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী অতুল শীল। প্রায় ৪০ বছর ধরে কাঁচি-চিরুনি হাতে মানুষের চুল কেটে আসছেন তিনি।জীবনের চার দশক কেটে গেছে মানুষের চুল কাটতে কাটতে। একসময় মাত্র ২ টাকা পারিশ্রমিকে চুল কাটার কাজ শুরু করেছিলেন অতুল শীল। সময়ের সঙ্গে বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়, বদলেছে মানুষের চাহিদা, এসেছে আধুনিক সেলুন। আর তাঁর চুল কাটার পারিশ্রমিকও বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা। তবে পারিশ্রমিক বাড়লেও আগের মতো খদ্দের নেই। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫ জনের চুল কাটেন তিনি। বয়সের ভার আর আধুনিক সেলুনের বিস্তারের কারনে কাজ অনেকটাই কমে গেছে।
অতুল শীলের কাজের নির্দিষ্ট জায়গাও রয়েছে। বর্তমানে তিনি রবিবার গনককপাড়া, সোমবার পাঁচপাড়া এবং মঙ্গলবার শিকদারমল্লিক বাজারে বসে চুল কাটেন। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন বাজারেও কাঁচি-চিরুনি নিয়ে ছুটে যান। ফুটপাত কিংবা বাজারের কোনো এক কোনে বসেই চলে তাঁর জীবিকার লড়াই।
এই পেশার আয় দিয়েই একসময় সংসারের হাল ধরেছেন তিনি। অভাবের মধ্যেও দুই মেয়েকে বিএ পর্যন্ত পড়িয়ে পাশ করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলে এখন বাবার পেশারই উত্তরসূরি। ফলে অতুল শীলের হাতে ধরা সেই কাঁচি শুধু চুল কাটার যন্ত্র নয়—এটি তাঁর পরিবারের চার দশকের সংগ্রাম, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার গল্পেরও অংশ।
অতুল শীল বলেন, আগে লোকজন হইতো, এখন বিভিন্ন দোকান হইয়া কাজকাম কম। ২ টাকা থেকে শুরু করে এখন ৬০ টাকা করে নেই। এই কাজের উপর থেকেই সংসার চালিয়ে এসেছি এবং দুই মেয়েরে বিএ পাশ করিয়েছি।
শহর-বন্দর থেকে শুরু করে গ্রামের বাজারেও এখন গড়ে উঠেছে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন সেলুন। বৈদ্যুতিক ট্রিমার, বিভিন্ন ধরনের হেয়ার কাট, আধুনিক চেয়ার ও সাজসজ্জার কারনে নতুন প্রজন্মের অনেকেই এসব সেলুনমুখী। ফলে অতুল শীলের মতো পুরোনো পদ্ধতিতে চুল কাটা নরসুন্দরদের কাজ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
তবুও থেমে নেই অতুল শীলের কাঁচি। বয়স ৬৫ হলেও জীবিকার তাগিদে এখনো নিয়মিত বাজারে বসেন। তাঁর হাতে কাঁচি চলার সঙ্গে সঙ্গে যেন ফিরে আসে গ্রামবাংলার পুরোনো দিনের সেই পরিচিত দৃশ্য।
সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের চুল কাটার ধরন। ২ টাকার পারিশ্রমিক বেড়ে হয়েছে ৬০ টাকা। কমেছে খদ্দের, কমেছে কাজ। কিন্তু কাঁচির সেই ‘ক্যাচ ক্যাচ’ শব্দ এখনো থামেনি। সেই শব্দেই আজও চলে অতুল শীলের সংসার।
ভোরের আকাশ/ এনউব