চট্টগ্রামে দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, আক্রান্তের প্রায় অর্ধেক নারী-শিশু

চট্টগ্রামে দিন দিন বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। সংক্রমণ বৃদ্ধির পাশাপাশি নারী ও শিশুদের আক্রান্তের হারও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৬৯৫ জন। তাদের মধ্যে ৪৫৭ জন নারী ও ৩১২ জন শিশু। অর্থাৎ নারী ও শিশু মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৬৯ জন, যা মোট আক্রান্তের ৪৫ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত পুরুষের সংখ্যা ৯২৬ জন। মোট আক্রান্তের হিসাবে পুরুষের সংখ্যা বেশি হলেও নারী ও শিশু মিলিয়ে আক্রান্তের হার প্রায় অর্ধেক। মোট আক্রান্তের মধ্যে নারীদের হার ২৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং শিশুদের ১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ।
২৪ আগস্ট পর্যন্ত নতুন করে ৩৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৭ জন পুরুষ, ১২ জন নারী ও ৯ জন শিশু। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা গেছেন তিনজন। এর মধ্যে একজন পুরুষ ও দুজন নারী। বর্তমানে চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১২৬ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ৫৬৩ জন।
আগস্টেই অর্ধেকের বেশি রোগী
চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আগস্ট মাসে। চলতি মাসের প্রথম ২৪ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৮৬১ জন, যা বছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা। অর্থাৎ বছরের মোট আক্রান্তের প্রায় ৫১ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছেন শুধু আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেই।
রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে চিকিৎসার চাপ। মোট আক্রান্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার ৭৩৬ জন, জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৭১৬ জন এবং অন্যান্য জেলার ২৪৩ জন রয়েছেন।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন সীতাকুণ্ডে—২০৫ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ১২৯ জন, বাঁশখালীতে ৫৪ জন, লোহাগাড়ায় ৪৭ জন এবং রাউজানে ৪৫ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
আক্রান্তের সংখ্যায় পুরুষ এগিয়ে থাকলেও মৃত্যুর চিত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন প্রবণতা। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া তিনজনের মধ্যে দুজনই নারী।
চিকিৎসা নিতে দেরি করায় বাড়ছে ঝুঁকি
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. হামিদুল্লাহ মেহেদীর মতে, অনেক মানুষ এখনো ডেঙ্গুর প্রাথমিক উপসর্গকে সাধারণ জ্বর বা সর্দি-কাশি ভেবে অবহেলা করেন। ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে রোগ জটিল পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
তিনি বলেন, নারীদের একটি অংশ অসুস্থ হলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেন না। ফলে হাসপাতালে আসার সময় তাদের শারীরিক অবস্থা বেশি খারাপ থাকতে পারে। চলতি বছর পুরুষের তুলনায় নারীদের মৃত্যুর হার বেশি হওয়ার পেছনে চিকিৎসা নিতে দেরি করার বিষয়টি ভূমিকা রাখতে পারে।
বিআইটিআইডির মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, কিছু ক্ষেত্রে নারীদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম থাকতে পারে। বিশেষ করে সন্তান প্রসবের পর শারীরিক দুর্বলতার কারণে সংক্রমণের প্রভাব বেশি হতে পারে।
তার মতে, গর্ভবতী নারী এবং মাসিক চলাকালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে জটিলতার আশঙ্কা আরও বাড়তে পারে। তাই জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথাব্যথা বা ডেঙ্গুর অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও চট্টগ্রাম নিয়ে সতর্কবার্তা
চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ উঠে এসেছে সাম্প্রতিক একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায়। এলসেভিয়ারের সহযোগী চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘আইজেআইডি রিজিওনস’-এ প্রকাশিত ‘দ্য অ্যানুয়াল রিকারেন্স অব ডেঙ্গু ইন বাংলাদেশ: এ পারসিস্টেন্ট থ্রেট’ শীর্ষক গবেষণায় চট্টগ্রামকে ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ নগর হটস্পট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত ওই গবেষণায় বলা হয়েছে, অতিরিক্ত জনসংখ্যা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ঘনবসতি ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের কারণে চট্টগ্রামের মতো শহরে ডেঙ্গু সংক্রমণের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বাংলাদেশের উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া, বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনবহুল এলাকায় কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি ডেঙ্গুর পুনরাবৃত্ত সংক্রমণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শুধু ফগিং বা কীটনাশক ছিটিয়ে এ সমস্যা দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলেও গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে এডিস মশার প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত রোগ নির্ণয় সুবিধা, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী এবং দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগের ঘাটতিও ডেঙ্গু মোকাবিলায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নগরের আট ওয়ার্ডে এডিসের উচ্চঝুঁকি
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরে এডিস মশার উপস্থিতির চিত্রও উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৮ থেকে ১৮ জুন পরিচালিত প্রাক-বর্ষা জরিপে নগরের ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়।
জরিপে ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এতে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া যায় ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ছিল ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, অথচ নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। অন্যদিকে ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।
জরিপের নেতৃত্ব দেওয়া বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ জানান, নগরের আটটি ওয়ার্ডকে এডিস মশার উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
উচ্চঝুঁকির তালিকায় রয়েছে ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩ নম্বর পাঁচলাইশ, ২ নম্বর জালালাবাদ, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা, ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ও ৩৯ নম্বর দক্ষিণ হালিশহর ওয়ার্ড।
জরিপে শনাক্ত হওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। নগরে পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে দীর্ঘসময় পানি সংরক্ষণ এবং নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবিস্তারের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে।
প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ
চট্টগ্রামের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি বলছে, এটি এখন আর শুধু মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বছরের আট মাসে ১ হাজার ৬৯৫ জন আক্রান্ত হওয়া, তাদের প্রায় অর্ধেক নারী ও শিশু হওয়া এবং আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেই ৮৬১ জনের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করছে।
এর সঙ্গে নগরের বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার উচ্চ ঘনত্ব এবং আন্তর্জাতিক গবেষণায় চট্টগ্রামকে উচ্চঝুঁকির শহর হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ, নির্মাণাধীন ভবন ও বাসাবাড়িতে নজরদারি, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি। বিশেষ করে নারী, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ভোরের আকাশ/ এনউব