এক র্যাম্পের জটে থেমে ছিল নগরীর গতি
এবার পূর্ণ সুবিধার পথে শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সড়ক

চট্টগ্রামের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এখানে থাকে মানুষের ভিড়, পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ এবং অফিসগামী মানুষের ব্যস্ততা।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরীর এই অংশে যানজট দীর্ঘদিনের পরিচিত সমস্যা। সেই চাপ কমাতে নির্মিত হয়েছে শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সড়ক। কিন্তু উড়াল সড়ক চালু হওয়ার পরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ আগ্রাবাদ র্যাম্প নির্মাণ না হওয়ায় প্রকল্পটির পূর্ণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন নগরবাসী।
দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনিক জটিলতা, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন, জমি ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয় সমস্যার কারণে আটকে ছিল আগ্রাবাদ র্যাম্পের কাজ। তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পর এখন সেই জট খুলতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, র্যাম্পটি চালু হলে চট্টগ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আসবে।
লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত নির্মিত শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সড়ক নগরীর উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ তৈরির অন্যতম বড় প্রকল্প। উড়াল সড়কের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যস্ত সড়কের ওপর যানবাহনের চাপ কমিয়ে দ্রুত চলাচলের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু আগ্রাবাদ অংশে সরাসরি সংযোগ না থাকায় অনেক যানবাহনকে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পুরোপুরি নিতে পারছিল না।
বিশেষ করে বন্দর, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা ও আশপাশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে উড়াল সড়কের কার্যকর সংযোগ তৈরি হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি উড়াল সড়কের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে এর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বা র্যাম্পের ওপর। মূল সড়ক তৈরি হলেও সংযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।
সিডিএ সূত্র জানায়, শুরুতে উড়াল সড়কের সঙ্গে মোট ১৫টি র্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। পরে বাস্তবতা বিবেচনায় কয়েকটি র্যাম্প স্থগিত রেখে ৯টি র্যাম্প নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি র্যাম্পের কাজ এগিয়ে গেলেও আগ্রাবাদ র্যাম্পে এসে তৈরি হয় জটিলতা।
কারণ এই র্যাম্প নির্মাণের জন্য প্রয়োজন ছিল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয়। বাংলাদেশ বেতার, জীবন বীমা করপোরেশন, যমুনা অয়েল কোম্পানিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জমি ও স্থাপনার বিষয় যুক্ত থাকায় জায়গা নির্ধারণ, অনুমোদন এবং প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগে।
একাধিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনা, দাপ্তরিক অনুমোদন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো দীর্ঘ হওয়ায় প্রকল্পের এই অংশ পিছিয়ে যায়। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে শুধু নির্মাণ কাজ নয়, জমি, সংযোগ সড়ক, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুমতি এবং ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা সব বিষয় আগেই সমন্বয় করা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে বিলম্ব হলে পুরো প্রকল্পের সুফল পেতে সময় লাগে।
আগ্রাবাদ র্যাম্প দেরিতে শুরু হওয়া নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন ছিল এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগ কেন আগে সম্পন্ন হলো না? সংশ্লিষ্টদের মতে, বিষয়টি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়; বরং বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে একাধিক সংস্থার সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জ এখানে ভূমিকা রেখেছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব জায়গায় সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকে, সেখানে সিদ্ধান্ত নিতে স্বাভাবিকভাবেই বেশি সময় লাগে। তবে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সড়কের পূর্ণ সুফল নগরবাসীর কাছে পৌঁছে দিতে আগ্রাবাদ র্যাম্প নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, র্যাম্প নির্মাণে যে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক জটিলতা ছিল, তা সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে এবং ডিসেম্বর মাসে প্রকল্প উদ্বোধনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আগ্রাবাদ এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, র্যাম্প চালু হলে প্রতিদিনের ভোগান্তি কমবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, যানজটের কারণে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ে। দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হলে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে।
অফিসগামী মানুষের প্রত্যাশা, উড়াল সড়ক ও র্যাম্প পুরোপুরি চালু হলে যাতায়াতের সময় কমবে। বিশেষ করে বিমানবন্দর, বন্দর ও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে চলাচল আরও সহজ হবে। তবে অনেকের আশঙ্কা, শুধু র্যাম্প চালু করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। সঠিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামের মতো দ্রুত বর্ধনশীল নগরীতে শুধু নতুন সড়ক তৈরি নয়, বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। উড়াল সড়ক চালুর পর যানবাহনের চাপ কোথায় গিয়ে পড়বে, কোন এলাকায় নতুন চাপ তৈরি হবে এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
তাদের মতে, আগ্রাবাদ র্যাম্প চালু হলে এটি নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করবে। তবে এর সুফল ধরে রাখতে হলে র্যাম্পের সঙ্গে সংযুক্ত সড়কগুলোর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর, বিমানবন্দর ও বাণিজ্যিক এলাকাকে ঘিরে নগরীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এই বাস্তবতায় দ্রুত ও কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি। আগ্রাবাদ র্যাম্প নির্মাণের মাধ্যমে শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়াল সড়ক তার পূর্ণ কার্যকারিতার দিকে এগোচ্ছে।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর নগরবাসীর প্রত্যাশা এবার যেন আর কোনো প্রশাসনিক জটিলতায় উন্নয়নকাজ থেমে না থাকে। কারণ একটি উড়াল সড়কের সাফল্য শুধু কংক্রিট ও ইস্পাতের কাঠামোয় নয়; এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে মানুষ কতটা দ্রুত, নিরাপদ ও স্বস্তিতে চলাচল করতে পারছে তার ওপর।
ভোরের আকাশ/ র.ই