মেয়াদোত্তীর্ণ কিট-ইচ্ছেমতো ফি, রাঙামাটিতে এবিসি’সহ ৩ ডায়াগনস্টিককে জরিমানা

মেয়াদোত্তীর্ণ রিএজেন্ট ও কিট দিয়ে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, নির্ধারিত মূল্যতালিকা না টাঙিয়ে ইচ্ছেমতো টাকা আদায়, নষ্ট যন্ত্রপাতি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও নানা অব্যবস্থাপনার মধ্যদিয়ে পার্বত্য রাঙামাটি শহরে তথাকথিত চিকিৎসা সেবার ব্যবসা পরিচালনা করছে অনেকগুলো ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ।
মঙ্গলবার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল থেকে সন্ধ্যারাত পযন্ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে এমনই চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সরেজমিন সত্যতা পেয়েছে সংশ্লিষ্ট্য কর্তৃপক্ষ।
দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ভোক্তাদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সমন্বয়ে রাঙামাটি শহরের তিনটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে প্রতিষ্ঠান তিনটিকে মোট ৯০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
অভিযানে সবচেয়ে বেশি জরিমানা করা হয় হাসপাতাল রোডে অবস্থিত এবিসি ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ৫০ হাজার টাকা। মোবাইল কোর্ট সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে মেয়াদোত্তীর্ণ কিট ব্যবহার করে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রমাণ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিপরীতে নির্ধারিত মূল্যতালিকা অনুযায়ী অর্থ আদায়ের পরিবর্তে ইচ্ছেমতো মূল্য নেওয়ার অভিযোগেরও সত্যতা পাওয়া যায়।
অভিযানকালে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন অনিয়মের কারণে প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে সতর্ক করার পাশাপাশি ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ফলোআপে রাখার কথা জানিয়েছেন মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারীরা।
এদিকে বনরূপা বাজারের বনরূপা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে আরও চাঞ্চল্যকর চিত্র পাওয়া যায়। মোবাইল কোর্ট সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব সক্ষমতা সীমিত হলেও সাইনবোর্ডে শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সেবা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির এক্স-রে মেশিন দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট অবস্থায় রয়েছে।
অভিযানসংশ্লিষ্টরা জানান, সীমিত সংখ্যক পরীক্ষা করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি রোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে বাইরে পাঠিয়ে পরীক্ষা করিয়ে আনে। এ ক্ষেত্রে রোগীদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে মূল্য নির্ধারণ করে অর্থ আদায় করছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। এসব অনিয়মের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অন্যদিকে ভোক্তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে বনরূপা এলাকার প্যানাসিয়া ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও অভিযান চালানো হয়। সেখানে মেয়াদোত্তীর্ণ কিট দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার বিষয়টি মোবাইল কোর্টের নজরে আসে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযান সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রোগী ও স্থানীয় ভোক্তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন অভিযোগ আসছিল। বিশেষ করে পরীক্ষার মূল্য আগে থেকে স্পষ্টভাবে না জানানো, মূল্যতালিকা প্রদর্শন না করা, ইচ্ছেমতো টাকা নেওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ কিট ব্যবহার এবং সেবার মান নিয়ে অসন্তোষের অভিযোগ ছিল।
মোবাইল কোর্টে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় এসব অভিযোগের কিছু অংশের সত্যতাও পাওয়া যায় বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাদের মতে, একজন রোগী যখন কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করাতে যান, তখন তিনি শুধু অর্থের বিনিময়ে একটি রিপোর্টই কিনছেন না; তার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও ওই রিপোর্টের ওপর নির্ভর করে। ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ কিট, নষ্ট যন্ত্রপাতি কিংবা অনুপযুক্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হলে তা রোগীর জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবারের অভিযানে পাওয়া অনিয়মের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিকভাবে জরিমানা ও সতর্ক করা হয়েছে। তাদের কার্যক্রম পরবর্তীতে ফলোআপ করা হবে। সতর্ক করার পরও যদি প্রতিষ্ঠানগুলো আইন ও বিধিবিধান মেনে কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযানে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ, সহকারী পরিচালক রানা দেব নাথ, জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধি ও রাঙামাটি সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আল-মুনতাসির মামুন মনি এবং রাঙামাটি সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কো-অর্ডিনেটর মেডিকেল অফিসার ডা: আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগীর নিরাপত্তা, সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং স্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ভোরের আকাশ/এম