পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা চর কুকরি-মুকরি, প্রকৃতির টানে বাড়ছে পর্যটক

সাগরের নীল জলরাশি, দীর্ঘ সৈকত, সবুজ ম্যানগ্রোভ বন ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ—প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্যে ভরপুর ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার চর কুকরি-মুকরি। কোলাহলমুক্ত এই দ্বীপে পা রাখলেই চোখে পড়ে সবুজের বিস্তৃতি, কানে আসে পাখির কলকাকলি। সমুদ্র, বন ও নদীর অপূর্ব মেলবন্ধনকে ঘিরে দক্ষিণাঞ্চলে সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে চর কুকরি-মুকরি।
চরফ্যাশন উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে এর অবস্থান। স্থানীয়দের কাছে ‘দ্বীপকন্যা’ নামেও পরিচিত চর কুকরি-মুকরি। ম্যানগ্রোভ বন, সমুদ্রসৈকত, নদী-খাল ও বৈচিত্র্যময় বন্যপ্রাণী এ অঞ্চলকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
চর কুকরি-মুকরির বিস্তীর্ণ এলাকায় রয়েছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। সুন্দরী, গেওয়া, পশুর ও কেওড়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালায় সমৃদ্ধ এ বন। স্থানীয়দের দাবি, বনের ভেতর ও আশপাশে চিত্রা হরিণ, বানর, উদবিড়াল, শিয়াল, বনবিড়াল ও বনমোরগসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে।
শীত মৌসুমে দ্বীপটির সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকদের পাশাপাশি এ সময় অতিথি পাখিরও আগমন ঘটে। পাখির কলকাকলি, সবুজ বন ও নীল জলরাশির মেলবন্ধনে পুরো এলাকা হয়ে ওঠে আরও মনোমুগ্ধকর।
চর কুকরি-মুকরির অন্যতম আকর্ষণ নারিকেল বাগান। ম্যানগ্রোভ বন পেরিয়ে নারিকেল বাগানে পৌঁছালে সামনে খুলে যায় বিস্তৃত জলরাশি ও আকাশ। ছবি তোলা, ঘোরাঘুরি ও ক্যাম্পিংয়ের জন্য জায়গাটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
এখানে রয়েছে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ তারুয়া সৈকত। দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র, নির্জন সৈকত ও সবুজ বন একসঙ্গে উপভোগের সুযোগ থাকায় তারুয়া দিন দিন পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্যও বাড়তি আকর্ষণ তৈরি করে।
রাত কাটানোর জন্য অনেকে সাগরপাড়ে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্পিং করেন। ভোরের পাখির ডাক, বিকেলের সূর্যাস্ত ও সমুদ্রের ঢেউ—প্রকৃতির খুব কাছাকাছি থাকার এমন অভিজ্ঞতাই পর্যটকদের বারবার টেনে আনে।
চর কুকরি-মুকরিতে রয়েছে একটি উঁচু ওয়াচ টাওয়ার। সেখান থেকে চারপাশের বন, নদী ও বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের দৃশ্য দেখা যায়। কালিরচর, তারুয়া ও ঢালচরের নৈসর্গিক সৌন্দর্যও পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।
পর্যটননির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ২৫ জানুয়ারি এখানে ইকোপার্ক স্থাপন করা হয়।
তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ হলেও চর কুকরি-মুকরিতে পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এখনো পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে যাতায়াত ব্যবস্থা, আবাসন, পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো, নিরাপদ নৌযান ও বিনোদন সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।
পর্যটকদের মতে, কুকরি-মুকরির সবচেয়ে বড় সম্পদ এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। তাই পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি এলাকার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
শীত মৌসুম এলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসেন চর কুকরি-মুকরি ও তারুয়া সৈকতে। পরিবার, বন্ধু কিংবা দলবেঁধে আসা পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে চর কুকরি-মুকরি ঘুরতে আসা রাকিব হাসান বলেন, “কুকরি-মুকরির সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। চারদিকে সবুজ বন, নদী ও সাগর—সব মিলিয়ে জায়গাটি সত্যিই অসাধারণ। তবে পর্যটকদের জন্য যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা আরও উন্নত করা প্রয়োজন।”
বরিশাল থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা রাইসুল আলম বলেন, “এর আগে অনেক পর্যটনকেন্দ্রে গিয়েছি। কিন্তু কুকরি-মুকরির সৌন্দর্য একেবারেই আলাদা। বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ বন ও তারুয়া সৈকতের পরিবেশ খুবই মনোমুগ্ধকর। সুযোগ পেলে আবারও এখানে আসতে চাই।”
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক মেহেদী হাসান বলেন, “এখানে এসে মনে হয়েছে শহরের ব্যস্ততা থেকে অনেক দূরে প্রকৃতির কাছে চলে এসেছি। সূর্যাস্ত, সৈকত ও বনের পরিবেশ খুব ভালো লেগেছে। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ নৌযান ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আরও বেশি মানুষ এখানে আসবেন।”
ভোলা থেকে পরিবার নিয়ে আসা নাজমা সুলতানা বলেন, “শিশুদের নিয়ে এমন প্রাকৃতিক পরিবেশে ঘুরতে পারা আনন্দের। তবে পরিবার নিয়ে থাকার জন্য পর্যাপ্ত ভালো মানের হোটেল ও সব ধরনের খাবারের ব্যবস্থা থাকলে ভ্রমণ আরও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হতো।”
আরেক পর্যটক তানভীর আহমেদ বলেন, “কুকরি-মুকরির সবচেয়ে বড় সম্পদ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এখানে কৃত্রিমতার চেয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্যই বেশি। তাই পর্যটন উন্নয়নের পাশাপাশি বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া দরকার।”
পর্যটকদের অভিমত, পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে চর কুকরি-মুকরি দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় ইকোট্যুরিজম স্পটে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা