ফেনীতে সক্রিয় এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার সিন্ডিকেট

ফেনীতে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার নজর এড়িয়ে এক শ্রেণির ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। ফলে কয়েকদিন ধরেই বাড়তি দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ভোক্তারা।
জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত অভিযান থাকলেও বাজারে অনিয়ম থামছে না। সোমবার ফেনী শহরের পোস্ট অফিস রোড এলাকায় ভোক্তা অধিকারের অভিযানে বিপ্লব ট্রেডার্স নামের একটি দোকানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হলেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে জেলার অন্যান্য এলাকায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশাসনের চলমান অভিযান এড়াতে ফেনীর দাউদপুল এলাকায় আইগ্যাস, টোটাল, বসুন্ধরা, পেট্রোম্যাক্সসহ বিভিন্ন কোম্পানির পরিবেশক ও ডিলার—রাসেল এন্টারপ্রাইজ, ডিরেক্ট ডেলিভারি, মেসার্স ট্রেড কিউ করপোরেশনসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দোকানের সাটার বন্ধ করে আত্মগোপনে রয়েছে। পরিবেশক পর্যায়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক খুচরা বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হয়। বেশি দামে কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে বলেই বাড়তি দামে বিক্রি ছাড়া উপায় নেই।
সূত্র জানায়, গত ৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজি গ্যাসের মাসিক খুচরা মূল্য নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। বর্তমানে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের জন্য গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি।
ভুক্তভোগী গৃহিণী আফসানা বলেন, “টেলিভিশনে সরকারিভাবে দাম ঘোষণা করা হয়, কিন্তু দোকানে গেলে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যায় না। অভিযোগ করবো কোথায় বুঝতে পারি না।”
খাজুরিয়া এলাকায় গ্যাস নিতে আসা ওমর ফারুক জানান, বেশি দাম দিয়েও অনেক সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা দাবি করেন।
এক পরিবেশক রবিন জানান, কোম্পানি থেকে সরবরাহ কম থাকায় তাদের দৈনিক বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। আগে যেখানে প্রতিদিন ৪০০–৫০০ সিলিন্ডার বিক্রি হতো, এখন তা নেমে এসেছে ১৫০–২০০-তে। তিনি দাবি করেন, কোম্পানির কাছ থেকেই বেশি দামে গ্যাস কিনতে হওয়ায় বাজারে নির্ধারিত দামে বিক্রি সম্ভব হচ্ছে না।
ট্রাংক রোডের নবাব বিরিয়ানি হাউজের স্বত্বাধিকারী বলেন, দৈনিক দুটি সিলিন্ডার প্রয়োজন হলেও দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনায় হিমশিম খেতে হচ্ছে।
অপর গৃহিণী মেহেরুন নেসা জানান, ১৪৫০ টাকা দিয়ে একটি সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। তদারকির অভাবেই এই অনিয়ম চলছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ওমেরা এলপিজির পরিবেশক সাইফুল ইসলাম ফটিক দাবি করেন, তাদের কোম্পানিতে গ্যাসের কোনো সংকট নেই। তবে কিছু কোম্পানির সরবরাহ সমস্যার কারণেই বাজারে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, পাইকারি পর্যায়ে ১৩৮০ থেকে ১৪০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে, যা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আসাদুল ইসলাম বলেন, “বেশি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগে ফেনী শহরে একজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তবে নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।”
এদিকে দাগনভূঞায় উচ্চমূল্যে গ্যাস বিক্রির দায়ে এক ব্যবসায়ীকে তিন হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহীদুল আলম।
ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, “জ্বালানি নিরাপত্তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এলপিজি বাজারে কার্যকর মনিটরিং না থাকলে সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। নিয়মিত অভিযান, কঠোর শাস্তি ও ভোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই অনিয়ম বন্ধ হবে না।”
ভোরের আকাশ/এসএইচ