কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা শুরু, শর্ত ভাঙলে কঠোর ব্যবস্থা

দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ১০ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আগামী ১১ আগস্ট থেকে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে আবারও মাছ শিকার, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ উন্মুক্ত হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের খবরে হ্রদের ওপর নির্ভরশীল জেলে, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে দেশীয় মাছের সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে মাছ শিকার, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত শর্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। শর্ত লঙ্ঘন করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফীর স্বাক্ষরিত ৬ আগস্টের এক আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। আদেশে বলা হয়েছে, কাপ্তাই হ্রদে মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কমিটির গত ২৭ জুলাইয়ের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মাছ আহরণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১০ আগস্ট রাত ১২টা থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরা যাবে। তবে আহরিত মাছ সরবরাহ ও বাজারজাত করা যাবে ১১ আগস্ট ভোর ৬টা থেকে।
হ্রদে মাছ শিকারের জন্য বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি), রাঙামাটি থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। একই সঙ্গে আহরিত মাছের জন্য নির্ধারিত শেয়ার বা শুল্ক পরিশোধ করতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, বিএফডিসির নির্ধারিত অবতরণ কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোনো স্থানে হ্রদের মাছ নামানো যাবে না। নির্ধারিত শুল্ক পরিশোধ ছাড়া কোনো মাছ বা শুঁটকি ক্রয়-বিক্রয়ও করা যাবে না। নির্ধারিত সময়ের বাইরে মাছ অবতরণ নিষিদ্ধ থাকবে।
কাপ্তাই হ্রদের ঘোষিত মৎস্য অভয়াশ্রমগুলোতে সারা বছরই মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। মাছের পোনা ও প্রাকৃতিক প্রজনন রক্ষায় এ নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৯ ইঞ্চি বা ২৩ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের মাছ ও মাছের পোনা ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। দেশীয় মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হ্রদের তলদেশ থেকে গাছের গুঁড়ি বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘গুইট্টা’ তোলা, উঠানো বা অপসারণের ওপরও সারা বছর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, চিতল, ফলি, বোয়ালসহ বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন বৃদ্ধি ও বিলুপ্তি রোধে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রাঙামাটি মৎস্য উন্নয়ন ও বিপণন কেন্দ্রের (বিএফডিসি) ব্যবস্থাপক কমান্ডার মোহাম্মদ ফয়েজ আল করিম বলেন, কাপ্তাই হ্রদ থেকে আহরিত মাছ ১১ আগস্ট থেকে সারাদেশে বিপণন শুরু হবে। এ জন্য বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে দীর্ঘদিন মাছ আহরণের অপেক্ষায় থাকা জেলেদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হ্রদ উন্মুক্ত হওয়ায় মাছ আহরণ, পরিবহন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মচাঞ্চল্য বাড়বে। একই সঙ্গে বাজারে দেশীয় মাছের সরবরাহও বাড়বে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নিষেধাজ্ঞার সুফল ধরে রাখতে ছোট মাছ ও পোনা নিধন বন্ধ, অভয়াশ্রমে মাছ শিকার বন্ধ এবং অবৈধভাবে মাছ অবতরণ ও বাজারজাতকরণ ঠেকাতে প্রশাসনের নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
কাপ্তাই হ্রদ রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের বৃহত্তম কৃত্রিম জলাধার। কর্ণফুলী নদীর ওপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে এ হ্রদের সৃষ্টি হয়। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে নির্মিত কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে এ হ্রদের সৃষ্টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
১৯৫৬ সালে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হলে বিশাল এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে প্রায় ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি প্লাবিত হয়। পাশাপাশি সরকারি সংরক্ষিত বন ও অশ্রেণিভুক্ত বিপুল পরিমাণ বনাঞ্চলও পানিতে তলিয়ে যায়।
কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির কারণে প্রায় ১৮ হাজার পরিবারের প্রায় এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন। সময়ের সঙ্গে হ্রদটি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদ ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে।
হ্রদের বিশাল জলরাশি রাঙামাটির অর্থনীতি, মৎস্য আহরণ, নৌপরিবহন ও পর্যটনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। নির্দিষ্ট সময়ে মাছ আহরণ বন্ধ রেখে প্রজননের সুযোগ তৈরি এবং পরে নিয়ম মেনে মাছ শিকার উন্মুক্ত করার মাধ্যমে এ মৎস্যসম্পদ টেকসইভাবে ব্যবস্থাপনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা শেষে ১১ আগস্ট থেকে কাপ্তাই হ্রদে মাছ শিকার উন্মুক্ত হওয়ায় জেলে, ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে হ্রদের মৎস্যসম্পদ রক্ষায় নির্ধারিত বিধিনিষেধ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপরই এ উদ্যোগের সুফল অনেকাংশে নির্ভর করবে।
ভোরের আকাশ/জেআ