কুষ্টিয়া মাদকাসক্ত বাবার কারনে মা হারিয়ে দিশেহারা শিশু আনহা

মা আমার সব থ্যেকি বেশি ভালবাসে। কিন্তু মা এখন কব্বরে। বাপ মাকে মাইরতো। আমি থাকলি অতটা মাইরতো না" কথাগুলো বলছিল মাত্র ৪ বছর বয়সে মা হারা শিশু আনহা।
আনহা মাদকাসক্ত স্বামী আকাশের নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করা মিম খাতুনের একমাত্র কন্যা। জীবনের কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই মা হারা এই শিশুর এখন আশ্রয় নানি জলি খাতুনের কাছে।
কাপড় সেলাই ও হস্তশিল্পে পারদর্শী মিম খাতুন বাবা হারায় ছোট বেলাতেই। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ভালবেসে বিয়ে করেন রং মিস্ত্রি আকাশের সাথে। কিছুদিনের মধ্যেই স্বামীর মাদকাসক্ত বিষয়টি বুঝতে পারেন মিম।
তারপর প্রতিদিনই চলতে থাকে মিমের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। নেশা করে বাসায় ফিরে সুমির সঙ্গে চেঁচামেচি ও ভাঙচুর নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়। এভাবেই কেটে গেছে দীর্ঘ ৭ বছর। মিম খাতুনের রয়েছে চার বছরের ফুটফুটে কন্যা রয়েছে। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় দুই বছর আগে বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনা ঘটে মিম ও আকাশের জীবনে। পরে শাশুড়ি ও স্বামীর আশ্বাসে শ্বশুরবাড়িতে ফিরলেও স্বামীর স্বভাবে পরিবর্তন না আসায় বাবার বাড়িতে অবস্থান নেয় মিম খাতুন।
হস্তশিল্পের মাধ্যমে নিজে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার পাশাপাশি ৪ বছর বয়সী একমাত্র শিশু সন্তান আনহার ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চলছিল তার জীবন সংগ্রাম। তবে শেষ রক্ষা হয়নি কুষ্টিয়া পৌরসভার বারাদী এলাকায় বাবার বাড়ি থেকে মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করার জন্য স্ত্রী মিমের ব্যবহৃত মুঠোফোন নিয়ে স্বামী পালানোর চেষ্টা করলে কিছু নেয় মিম খাতুন।
চলতি বছরের ১জুন কোন ফেরত নেওয়ার উদ্দেশ্যে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থানকালে স্বামীর নির্যাতনের একপর্যায়ে তাকে ঘরের বাসের আড়ার সাথে ঝুলন্ত অবস্থায় এলাকাবাসী উদ্ধার করে কুষ্টিয়া ২৫০ সয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩রা জুন মৃত্যুবরণ করে মিম খাতুন।
ঘটনার দিনের বর্ণনা যদি দিতে গিয়ে মৃত মিম খাতুনের মা জলি খাতুন ভোরের আকাশ কে জানান, ঘটনার দিন আমার মেয়ে মিম খাতুন আমাদের বাড়িতে অবস্থান করছিল। হঠাৎ আকাশ আসে এ সময় আমার মেয়ের সাথে তার কথা কাটাকাটি হয়। এর এক পর্যায়ে সে আমার মেয়ের ব্যবহৃত ফোন নিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে।
আমার মেয়ের তার কাছ থেকে ফোন উদ্ধারের জন্য তার পিছো নিয়ে শহরের কানাবিল মোড় এলাকায় আকাশের বাড়ি পর্যন্ত যায়। ঘটনার ঘণ্টাখানেক পর আমরা শুনতে পারি আমার মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।
আমরা খবর পেয়ে হাসপাতালে সেখানে তিন দিন ভর্তি থাকার পর আমার মেয়ে আইসিইউ তে মারা যায়। হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় তার গায়ে আমরা আঘাতের চিহ্ন দেখেছি।
মাদকাসক্ত আকাশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্কুলে পড়া অবস্থায় আকাশকে ভালবেসে আমার মেয়ে বিয়ে করে। পরে যখন আমরা জানতে পারি আকাশ মাদকাসক্ত। তখন আমার মেয়েকে আকাশের সাথে সংসার করতে নিষেধ করি। কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সে আমাদের কথা শোনেনি। আজ আমাদের কথা শুনলে তার এই পরিণতি হত না।
তিনি আরো বলেন, আমার মেয়ে হাতের কাজ জানতো তাই দিয়েই সে আমাদের বাড়িতে তার মেয়েকে নিয়ে থাকতো। আমি এই বয়সে স্বামীহারা - সন্তানহারা। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আমার সংসার। আমি নিজেই কাজ করে খাই। মেয়ে মারা যাওয়ার পর আমার নাতনির লেখাপড়াও বন্ধ হয়ে গেছে।
মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এর অপেক্ষায় করছি। বিষয়টি আমাদের এক জমাই দেখছে। আমরা গরীব মানুষ আমরা এসব মামলা বুঝিনা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানায়, কেউ বলতে পারবে না মিম খারাপ মেয়ে।মানুষ হিসেবে অত্যন্ত ভালো ছিল। স্বামী মাদকাসক্ত হওয়ায় আমরা অনেকবার তাকে ছেড়ে দিতে বলেছি। কিন্তু একমাত্র সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সে আমাদের কথা শোনেনি। আকাশের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ অনেক পুরাতন। তার এলাকার সবাই জানে সে মাদকাসক্ত। শুধু মাদকের কারণে একটি পরিবার আজ ধ্বংস হয়ে গেল। এর সঠিক বিচার হওয়া উচিত।
ময়নাতদন্তের বিষয় ২৫০সয্যা বিশিষ্ট কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ইকবাল হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, পোস্টমর্টেমের বিষয়ে এখন আমি কিছু বলতে পারছি না।এটা সংশ্লিষ্ট ডাক্তার বলতে পারবেন। তবে প্রাথমিক অবস্থায় যখন এই মেয়েটিকে নিয়ে আসা হয়েছিল তখন তার শরীরে ছোপ ছোপ কালো দাগ ছিল।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন মাতুব্বর জানান, ঘটনা একটি ইউডি মামলা হয়েছে। তবে এখনো ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। সাধারণত ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসতে একটু সময় লাগে। তবে ময়নাতদন্তে রিপোর্টে নেগেটিভ কিছু আসলে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ভোরের আকাশ/ র.ই