জীবননগরে ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডে বাড়ছে আতঙ্ক
রাত নামলেই নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় সাম্প্রতিক সময়ে ছিনতাই, হামলা ও হত্যাকাণ্ডের একাধিক ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে।
বিশেষ করে সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষ, ভ্যানচালক ও মোটরসাইকেল আরোহীদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম নিরাপত্তাহীনতা। কখন, কোথায় দুর্বৃত্তদের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারাতে হয়, এমনকি প্রাণনাশের শিকার হতে হয়—এমন আশঙ্কায় অনেকেই জরুরি প্রয়োজন ছাড়া রাতে ঘর থেকে বের হতেও সাহস পাচ্ছেন না।
একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধ দমনে কার্যকর নজরদারি, অপরাধীদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একসময় রাতের বেলায়ও উপজেলার বিভিন্ন সড়কে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা গেলেও বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নির্জন সড়ক কিংবা জনবসতি থেকে কিছুটা দূরের এলাকায় চলাচলের সময় ছিনতাইকারীদের হামলার আশঙ্কা করছেন পথচারীরা। অভিযোগ রয়েছে, দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে টাকা-পয়সা ও যানবাহন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে; কোথাও কোথাও বাধা দেওয়ায় হামলার শিকার হচ্ছেন নিরীহ মানুষ। ফলে রাতের সড়কগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন স্থানীয়দের অন্যতম প্রধান দাবি হয়ে উঠেছে।
যেসব সড়কে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ: স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, জীবননগর উপজেলার বেশ কয়েকটি সড়কে ছিনতাইয়ের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বিজিবি ক্যাম্প থেকে বাঁকা মাদ্রাসা সড়ক, সন্তোষপুর থেকে আন্দুলবাড়িয়া, হাসাদাহ থেকে রায়পুর, খয়েরহুদা থেকে কাশিপুর, বাঁকা থেকে সুটিয়া, উথলী থেকে মোল্লাবাড়ি, পিচমোড় থেকে গোয়ালপাড়া বাজার, পিচমোড় থেকে গয়েশপুর মোড়, জীবননগর থেকে দত্তনগর সড়ক এবং নারায়ণপুর সীমান্তের ইটভাটা থেকে গঙ্গাদাসপুর সড়ক। এসব সড়কের কয়েকটিতে অতীতেও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
তাঁদের ভাষ্য, সড়কগুলোর যেসব স্থানে জনসমাগম কম, আলো স্বল্প কিংবা দ্রুত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত, সেখানে রাতের নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। নিয়মিত পুলিশি টহল, সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
নিখোঁজের পর ভ্যানচালকের মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার: গত ১৯ অক্টোবর জীবননগর উপজেলার সাহাপুর গ্রামের মাঠ থেকে চান্দ আলী (৫৫) নামে এক ভ্যানচালকের অর্ধগলিত মস্তকবিহীন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি উপজেলার হাসাদাহ ইউনিয়নের বালিগর্ত পাড়ার মৃত জোনাব আলীর ছেলে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর পাখিভ্যান নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন চান্দ আলী। এরপর স্বজনেরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান পাননি। একপর্যায়ে সাহাপুর গ্রামের মাঠে মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে এবং পরিবারের সদস্যরা সেটি চান্দ আলীর বলে শনাক্ত করেন।
এ ঘটনায় তাঁর ব্যবহৃত পাখিভ্যানটিরও সন্ধান মেলেনি। এ কারণে তাঁকে হত্যার পর ভ্যানটি নিয়ে যাওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ভ্যানটির অবস্থান তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। মর্মান্তিক এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে শোকের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের চেষ্টা, হামলায় আহত ব্যক্তি: এর আগে গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে খয়েরহুদা-কুশিপুর সড়কে খয়েরহুদা গ্রামের বাসিন্দা বিল্লাল হোসেনের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ৭ থেকে ৮ জনের একটি দল তাঁর ওপর হামলা চালিয়ে তাঁকে রক্তাক্ত জখম করে। এ সময় তাঁর মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনার আগের দিন শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাঁকা বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন মাদ্রাসা সড়কে হামলার শিকার হন জীবননগর বাজারের মুদি ব্যবসায়ী আব্দুর জব্বার। অভিযোগ অনুযায়ী, দুর্বৃত্তরা তাঁকে আহত করে তাঁর কাছে থাকা ৪১ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এসব ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ায় রাতের সড়কে চলাচল নিয়ে মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে রাতে বাড়ি ফেরা ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মোটরসাইকেল আরোহীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
অপরাধ দমনে কার্যকর পদক্ষেপ চান এলাকাবাসী: স্থানীয় বাসিন্দা জামাল হোসেন বলেন, “বর্তমানে জীবননগর উপজেলার পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে রাতে বিভিন্ন সড়কে চলাচলের সময় ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় আমাদের মতো সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকি। একের পর এক ঘটনা ঘটলেও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চাই। সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।”
স্থানীয় বাসিন্দা গফুর হোসেন বলেন, “আগে মাঝেমধ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও ইদানীং এ ধরনের ঘটনা বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোতে পুলিশের কঠোর নজরদারি, নিয়মিত টহল এবং অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা দরকার। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা গেলে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।”
পুলিশের বক্তব্য: এ বিষয়ে জীবননগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোলায়মান শেখ জানান, ছিনতাইয়ের ঘটনায় এখন পর্যন্ত জীবননগর থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। তবে পাখিভ্যানচালক চান্দু আলী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় একটি মামলা রুজু করা হয়েছে। ছিনতাই প্রতিরোধে ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে মোবাইল টিমের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে বলে তিনি জানান।
জননিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ: সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো জীবননগরের রাতের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে। তবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো উপজেলাকে অপরাধীদের দখলে বলে চিহ্নিত করার পরিবর্তে, প্রকৃত অপরাধের ধরন, স্থান ও পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাই এখন জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে অপরাধীদের শনাক্ত, গ্রেপ্তার এবং আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কগুলোতে রাতের টহল জোরদার, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সন্দেহজনক চলাচলে নজরদারি এবং দ্রুত পুলিশি সাড়া নিশ্চিত করা হবে। মানুষের নিরাপদে বাড়ি ফেরা কিংবা জীবিকার তাগিদে রাতে সড়কে চলাচল যেন আতঙ্কের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়—এ জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।
ভোরের আকাশ/ এনউব