বাংলাদেশের প্রথম নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট সুরাইয়া জান্নাত খান

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি থেকে উঠে এসে বাংলাদেশের প্রথম নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন সুরাইয়া জান্নাত খান। পুরুষপ্রধান একটি পেশায় সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তাঁর এই অর্জন দেশের নারীদের জন্য তৈরি করেছে অনুপ্রেরণার নতুন দৃষ্টান্ত। পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
১৯৮৯ সালে বাংলাদেশের প্রথম নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন সুরাইয়া জান্নাত। আশির দশকে এই পেশায় নারীদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। এমন বাস্তবতায় নিজের যোগ্যতা, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি গড়ে তোলেন অনন্য এক ইতিহাস।
চট্টগ্রাম কমার্স কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করার পর ১৯৮৫ সালে এস এফ আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানিতে আর্টিকেলশিপের মাধ্যমে তাঁর পেশাগত যাত্রা শুরু হয়। চার বছরের কঠোর পরিশ্রম ও প্রস্তুতি শেষে ১৯৮৯ সালে অর্জন করেন কাঙ্ক্ষিত পেশাগত স্বীকৃতি।
তাঁর জীবনের একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কলেজে ভর্তির সময় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়ার স্বপ্নের কথা জানালে তৎকালীন অধ্যক্ষ তাঁকে ‘চার্টার্ড’ শব্দটির বানান জিজ্ঞাসা করেন। বানান করতে ভুল হওয়ায় তাঁকে বিদ্রূপের মুখোমুখি হতে হয়। তবে সেই অভিজ্ঞতায় দমে যাননি তিনি। বরং নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার সংকল্প আরও দৃঢ় হয় তাঁর।
চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সির কঠিন প্রস্তুতির সময় সংসার ও সন্তানের দায়িত্বও সামলাতে হয়েছে তাঁকে। একপর্যায়ে হাল ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা এলেও পরিবারের সমর্থন, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায় তাঁকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে।
পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের পর ব্র্যাকের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন সুরাইয়া জান্নাত খান। পরবর্তী সময়ে সেভ দ্য চিলড্রেনের ঢাকা কার্যালয়ে গ্রুপ চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর যুক্ত হন বিশ্বব্যাংকে। সেখানে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও সুশাসন জোরদারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করেন। দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
দেশের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের পেশাগত প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন তিনি। ২০২৫–২৬ মেয়াদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সুরাইয়া জান্নাত খান। পেশাগত শিক্ষা, আর্থিক প্রতিবেদন, নিরীক্ষার মানোন্নয়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায়ও কাজ করছেন তিনি।
পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি নিজ এলাকার সামাজিক উন্নয়নেও রয়েছে তাঁর আগ্রহ। চুনতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে চুনতি লাইট হাউজ, গ্রামীণ ডিজিটাল পাঠাগার উদ্যোগ ও মেয়েদের কল্যাণে পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা উল্লেখযোগ্য।
চুনতির মতো একটি এলাকা থেকে উঠে এসে দেশের প্রথম নারী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হওয়া, বিশ্বব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং আইসিএবির নেতৃত্বে জায়গা করে নেওয়া—সুরাইয়া জান্নাত খানের এই পথচলা প্রমাণ করে, প্রতিকূলতা ও দায়িত্বের চাপ অতিক্রম করেও লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। তাঁর অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বাংলাদেশের নারীদের পেশাগত অগ্রযাত্রার ইতিহাসেও এটি এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
ভোরের আকাশ/সু.পা