এক হাজার টাকার শুরু, থামেনি স্বপ্নের পথচলা

পাহাড়ের ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চারদিকে ঘন সবুজের আবরণ, বাঁশঝাড়ের ফাঁক গলে আসা বাতাস আর পাখির কিচিরমিচিরে মুখর পাকুয্যাছড়ি গ্রামের সকাল।
সেই নিরিবিলি পরিবেশে ছায়াঘেরা একটি খামারে ব্যস্ত কয়েকজন নারী-পুরুষ। কেউ মাশরুমের পরিচর্যা করছেন, কেউ স্পন বা বীজ তৈরির কাজে, আবার কেউ প্যাকেটজাত করছেন সদ্য সংগ্রহ করা মাশরুম। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ কৃষি খামার মনে হলেও, ভেতরে প্রবেশ করলেই ধরা পড়ে এক অন্য গল্প—স্বপ্ন, সংগ্রাম, অধ্যবসায় আর সফলতার গল্প।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের পাকুয্যাছড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা ‘ছাবা মাশরুম এগ্রো ফার্ম’ আজ শুধু একটি খামার নয়; এটি পাহাড়ে বিকল্প কৃষি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং আত্মনির্ভরতার এক অনন্য উদাহরণ। মাত্র এক হাজার টাকা দিয়ে ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করা এই উদ্যোগ এখন দেশের বিভিন্ন জেলায় উন্নতমানের মাশরুমের স্পন (বীজ) সরবরাহ করছে।
একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা এবং নতুন জাতের মাশরুম নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে একটি সম্ভাবনাময় কৃষি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
'ছাবা' নামের গল্প:
চাকমা ভাষায় ‘ছাবা’ অর্থ ছায়া। পাহাড়ি প্রকৃতির সেই ছায়ার সঙ্গেই নিজের স্বপ্নকে মিলিয়ে খামারের নাম রেখেছিলেন উদ্যোক্তা ওডিস চাকমা। তার বিশ্বাস ছিল, যেমন একটি গাছের ছায়া মানুষকে আশ্রয় দেয়, তেমনি একদিন এই খামারও মানুষের জীবিকার আশ্রয় হবে। এক যুগেরও বেশি সময় পর সেই বিশ্বাস আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
শুরুটা ছিল কঠিন:
২০১২ সালে হাতে ছিল মাত্র এক হাজার টাকা। আধুনিক প্রযুক্তি ছিল না, ছিল না কোনো প্রশিক্ষণ কিংবা বড় ধরনের বিনিয়োগ। মাশরুম চাষ সম্পর্কে মানুষের ধারণাও ছিল সীমিত। অনেকেই এই উদ্যোগকে অবাস্তব বলে মনে করেছিলেন।
কিন্তু সব বাধা অতিক্রম করে ওডিস চাকমা ধীরে ধীরে নিজের অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছেন। বিভিন্ন উৎস থেকে শিখেছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন, ব্যর্থ হয়েছেন, আবার নতুন করে শুরু করেছেন। সেই নিরলস প্রচেষ্টাই আজ তাকে একজন সফল উদ্যোক্তার পরিচয় এনে দিয়েছে।
শুধু মাশরুম নয়, তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের বীজও বর্তমানে ছাবা মাশরুম এগ্রো ফার্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নিজস্ব স্পন উৎপাদন ল্যাব। এখানেই তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের মাশরুমের বীজ, যা খাগড়াছড়ির গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক নতুন উদ্যোক্তা এখান থেকেই স্পন সংগ্রহ করে নিজেদের খামার গড়ে তুলছেন।
অফ-সিজনে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ কেজি এবং মৌসুমে ৫০ থেকে ৬০ কেজি মাশরুম বিক্রি হয়। কখনো কখনো সেই পরিমাণ ১০০ কেজিও ছাড়িয়ে যায়। বাজারে মানসম্মত স্পনের চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে।
গবেষণার দিকেও সমান গুরুত্ব:
উৎপাদনের পাশাপাশি গবেষণাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন ওডিস চাকমা। বর্তমানে সাত থেকে আটটি জাতের মাশরুম নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ চলছে। গরম মৌসুমের জন্য পিওটান (ভুটানিজ), ওসি, অ্যাভ্যালু ও ব্ল্যাক ইয়ার এবং শীতকালীন এসকে (হাইব্রিড) ও ওএস জাতের উৎপাদন ও উন্নয়নে নিয়মিত গবেষণা করা হচ্ছে।
তার লক্ষ্য, পাহাড়ের আবহাওয়ার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি উপযোগী এবং অধিক ফলনশীল জাত নির্বাচন করে স্থানীয় কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করা।
কর্মসংস্থানের নতুন ঠিকানা:
এই খামারে বর্তমানে সারা বছর পাঁচজন স্থানীয় কর্মী নিয়মিত কাজ করেন। তাদের অনেকেই আগে অনিয়মিত শ্রমিক ছিলেন। এখন তারা নিয়মিত আয় করছেন, পরিবারের খরচ চালাচ্ছেন এবং সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যয় বহন করছেন। শুধু তাই নয়, মাশরুম উৎপাদন, স্পন তৈরি, পরিচর্যা, সংরক্ষণ ও প্যাকেটজাতকরণের মতো আধুনিক দক্ষতাও অর্জন করেছেন।
খামারের এক কর্মী বলেন, "আগে নিয়মিত কাজ ছিল না। এখন এই খামারের আয় দিয়েই সংসার চলে। এখানে কাজ করতে করতেই মাশরুম চাষের পুরো প্রক্রিয়া শিখেছি। ভবিষ্যতে নিজেরাও ছোট খামার করার স্বপ্ন দেখি।"
উদ্যোক্তার আক্ষেপ সব অর্জনের পরও একটি আক্ষেপ রয়ে গেছে ওডিস চাকমার।
তিনি বলেন, "মাত্র এক হাজার টাকা দিয়ে শুরু করেছিলাম। অনেক কষ্ট করে আজকের অবস্থানে এসেছি। এখন আমরা নিজেরাই উন্নতমানের স্পন উৎপাদন করছি এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি কারিগরি বা আর্থিক সহায়তা পাইনি। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা ও অর্থায়ন পেলে উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব।"
বর্তমানে তার মাসিক গড় আয় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। তবে তিনি লাভের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন মানসম্পন্ন উৎপাদন ও নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন:
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মাশরুম একটি সম্ভাবনাময় সুপার ফুড এবং পাহাড়ি অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী কৃষিপণ্য। অতিরিক্ত জমির প্রয়োজন না হওয়ায় এটি সহজেই বাড়ির আঙিনা বা ঘরেই উৎপাদন করা সম্ভব।
তিনি জানান, মাশরুম চাষ সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় জেলার সাতটি উপজেলায় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কার্যক্রম চলছে। ভাইবোনছড়ার উদ্যোক্তা ওডিস চাকমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে সাভারের জাতীয় মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পাহাড়ের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে মাশরুমের চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ এখনো দেশের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাহাড়ি অঞ্চলের আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা মাশরুম চাষের জন্য অনুকূল হওয়ায় খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে এই শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
যদি উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, গবেষণা, সহজ ঋণ, বাজারসংযোগ এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই খাত স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং কৃষিকে আরও বহুমুখী করে তুলবে।
একটি খামারের চেয়ে অনেক বেশি ওডিস চাকমার ছাবা মাশরুম এগ্রো ফার্ম এখন আর শুধু একটি ব্যবসা নয়। এটি পাহাড়ে স্বপ্ন দেখার সাহস, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি এবং বিকল্প কৃষির সম্ভাবনার প্রতীক। মাত্র এক হাজার টাকার ক্ষুদ্র উদ্যোগ যে একদিন কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং দেশব্যাপী বাজার গড়ে তুলতে পারে,তার জীবন্ত প্রমাণ এই খামার।
সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন শুধু একটি বিষয়—যথাযথ কারিগরি, প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক সহায়তা। সেটি নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ের এই ছোট্ট উদ্যোগ একদিন দেশের মাশরুম শিল্পের অন্যতম পথপ্রদর্শক হয়ে উঠতে পারে।
ভোরের আকাশ/রই