বিল ডাকাতিয়ায় জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান কবে, প্রশ্ন এলাকাবাসীর

খুলনার বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের জলাবদ্ধতা এখন স্থানীয় মানুষের কাছে দুর্ভোগের আরেক নাম। টানা চার বছর ধরে পানিবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খাল খনন, উন্নয়ন প্রকল্প ও নানা প্রতিশ্রুতির পরও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে এলাকাবাসীর মধ্যে। তাদের অভিযোগ, উন্নয়নের নামে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হলেও দুর্ভোগ কমেনি। বরং বিল ডাকাতিয়াকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক টানাপড়েন।
বারানসী থেকে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত প্রধান সড়কের বড় একটি অংশ বছরের বেশিরভাগ সময় পানির নিচে থাকে। ফলে স্থানীয়দের চলাচলের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে ডিঙি নৌকা। খালপথে যাতায়াতে জনপ্রতি প্রায় ১০ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন অসুস্থ রোগী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এ বছর তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হলেও জলাবদ্ধতার পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। অনেক পরিবার নিজেদের উদ্যোগে বাড়ির ভিটা উঁচু করায় ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। তবে অধিকাংশ রাস্তা এখনো পানির নিচে। এর পাশাপাশি খালের ওপর নির্মিত কয়েকটি নিচু কালভার্টের কারণে নৌযান চলাচলেও সমস্যা হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ পথ নৌকায় পাড়ি দেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না।
জলাবদ্ধতা নিরসনে বিল ডাকাতিয়া এলাকায় কোটি টাকা ব্যয়ে খাল পুনঃখননসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও খাল খনন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন ও প্রকল্পের অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, আগে খনন করা খাল পুনরায় খননের পরিবর্তে বিলের পানি নিষ্কাশনের সঙ্গে যুক্ত প্রধান নদীগুলো খনন করা হলে কার্যকর সমাধান মিলত। কিন্তু তাদের এই পরামর্শ উপেক্ষা করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। খাল খননের পরিবর্তে প্রধান নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবি এর আগেও স্থানীয় কৃষক ও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও নানা অনিয়মের কারণে এসব প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। এমনকি প্রকল্পের অব্যবহৃত প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হয়েছে বলেও তারা জানান।
এদিকে বারানসী-কৃষ্ণনগর সড়কের কার্পেটিংয়ের কাজ দুই বছরেও শেষ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের মতে, শুধু সড়ক নির্মাণ করলেই হবে না, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাস্তার উচ্চতা অন্তত দুই ফুট বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ বর্ষা মৌসুমের মাঝামাঝি সময়েই সড়কটি পানির নিচে চলে যায়। জলাবদ্ধতা ফাল্গুন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাও করছেন তারা।
কৃষ্ণনগর গ্রামের বাসিন্দা উজ্জ্বল সরকার বলেন, ‘ভোটের আগে সবাই রাস্তা ও পানি নিষ্কাশনের প্রতিশ্রুতি দেয়। ভোট শেষ হলে আর কেউ খোঁজ নেয় না। বিল ডাকাতিয়াকে নিয়ে শুধু রাজনীতি হচ্ছে।’
বারানসী গ্রামের সুব্রত মণ্ডল বলেন, ‘বছরের পর বছর একই অবস্থা। আমরা যে কী দুর্ভোগে আছি, তা কেউ বুঝবে না।’
তুষার মণ্ডল বলেন, ‘এভাবে পানিবন্দি হয়ে থাকার চেয়ে সরকার যদি অন্য কোথাও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করত, তাহলে হয়তো মুক্তি পেতাম।’
বিধান চন্দ্র রায় জানান, গ্রামবাসী নিজেদের উদ্যোগে এক লাখ টাকার বেশি খরচ করে রাস্তায় বালি ফেলেছেন। সম্প্রতি উপজেলা প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যও রাস্তা উঁচু করার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে খাল-নদী খনন, স্লুইসগেট সংস্কার ও পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।
চার বছর ধরে জলাবদ্ধতায় জর্জরিত বিল ডাকাতিয়ার মানুষের প্রশ্ন—কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও যদি পানি না নামে, তাহলে এই দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের শেষ কোথায়?
ভোরের আকাশ/জেআ