শামীম হত্যার দিনের ভিডিওতে শনাক্তদের নিয়ে কী বলছে বিএনপি-জামায়াত

দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত কয়েকজনকে মারধর, বিক্ষোভ মিছিল ও হাসপাতাল এলাকায় দেখা গেছে। ভিডিও পর্যবেক্ষণে ফজলুল হক আমিনী ও যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত সাদিকুল ইসলামকে শামীমের বুকে পা দিয়ে আঘাত করতে দেখা গেছে। হাসপাতাল থেকে শামীমকে বের করে মারধরের অভিযোগও উঠেছে। এ ঘটনায় আমিনীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে দুজনকে, বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে।
গত ১৩ অক্টোবর দেবহাটায় শামীমকে প্রথমে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলেও সেখানে ফের হামলার ঘটনা ঘটে। স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, হামলাকারীদের একটি অংশ হাসপাতালের ভেতর থেকে তাকে বের করে এনে মারধর করে। পরে শামীমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ফেসবুকে প্রচারিত এসব ভিডিও পর্যালোচনা করে কয়েকজনের পরিচয় ও ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।
ফেসবুকের ‘Fh Ameni’ নামের প্রোফাইল থেকে ফজলুল হক আমিনী লোকজনকে জড়ো করতে দুই দফা লাইভ করেছিলেন বলে ভিডিও পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে প্রচারিত একটি লাইভে কুলিয়ার একটি পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে শামীমকে রাস্তায় ফেলে মারধরের দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিও পর্যবেক্ষণে আমিনীকে শামীমের বুকের ওপর পা দিয়ে আঘাত করতে দেখা গেছে। একই ভিডিওতে পারুলিয়া ইউনিয়নের যুবদল নেতা হিসেবে পরিচিত সাদিকুল ইসলামকেও শামীমের বুকে পা দিয়ে আঘাত করতে দেখা যায়।
ঘটনাস্থলে আরও কয়েকজনকে দেখা যায়। তাদের মধ্যে জামায়াতের যুব বিভাগের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত আজহারুল ইসলাম রয়েছেন বলে প্রতিবেদকের ভিডিও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
এ সময় কুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি সাদেকুল ইসলাম শামীমকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান এবং হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করেন বলে ভিডিওতে দেখা যায়।
একই দিন সন্ধ্যায় ‘Md Azharul Satkhira’ নামে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ২৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের একটি লাইভ প্রচার করা হয় বলে জানা গেছে। ভিডিওর শুরুতে পারুলিয়া বাজার এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হতে দেখা যায়। ভিডিও পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মিছিলটির নেতৃত্বে ছিলেন ফজলুল হক আমিনী।
মিছিলে আমিনীর পাশাপাশি পারুলিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম রসুল, সাদিকুল ইসলাম, জামায়াতের আইবিডব্লিউএফ শাখার সদস্য হিসেবে পরিচিত মিজানুর রহমান মিজান, যুব বিভাগের আজহারুল ইসলাম এবং শিবিরকর্মী হিসেবে পরিচিত জাবীর আকরামকে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
মিছিলটি পরে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যায়। ভিডিওর বর্ণনা অনুযায়ী, হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ঢোকার পর স্লোগান জোরালো হয়। ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা বাধা দেন। একপর্যায়ে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং আনসার সদস্যরা পিছু হটেন।
প্রতিবেদকের ভিডিও পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আমিনী কয়েকজনকে হাসপাতালের দুটি প্রবেশপথে অবস্থান নিতে নির্দেশ দেন। এর কিছু সময় পর হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর শামীমকে শয্যা থেকে বারান্দায় এনে মারধর করা হয় বলে ভিডিও ও ঘটনার বর্ণনায় উঠে এসেছে। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে হামলাকারীদের একটি অংশ সরে যায়।
ঘটনার আগে ও চলাকালে ‘Md Azharul Satkhira’, ‘Serajul Live’, ‘Fh Ameni’ ও ‘SD Sadikul Islam’ নামে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভ প্রচার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে এসব ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ কপি, মূল উৎস এবং সময়ের ধারাবাহিকতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। মামলা হওয়ার পর কয়েকজন তাদের ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও বা লাইভ মুছে দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
ভিডিওতে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত কয়েকজনকে দেখা যাওয়ার বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এইচএম এমদাদুল হকের সঙ্গে কথা হয়।
তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে যাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন; তবে সবাই মারধরের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন, এমন নয়।’
তার ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ায় এলাকার কিছু তরুণ কৌতূহলবশত সেখানে গিয়েছিলেন। তাদের কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন, কেউ পরিস্থিতি দেখতে বা জানতে চেয়েছিলেন।
তবে সরাসরি মারধরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে চাইলে এমদাদুল হক দুজনের নাম উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে মারধরে সরাসরি অংশ নিতে দেখা গেছে, এমন দুজন হলেন শফিউল আলম আনিস ও সাদিকুল ইসলাম।’
তার বক্তব্যে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের পরিচয় ও ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এর আগে ১৫ অক্টোবর রাতে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের এক বিবৃতিতে শামীম হত্যার ঘটনায় সংগঠনের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংগঠনটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
একদিকে সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক অস্বীকার, অন্যদিকে ভিডিওতে দলটির সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত কয়েকজনের উপস্থিতি এবং এক নেতার বক্তব্যে দুজনের নাম উল্লেখ করার বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংগঠনটির সামগ্রিক সম্পৃক্ততা নির্ধারণ করা যায় না। প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা পৃথকভাবে তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
দেবহাটা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শেখ সিরাজুল ইসলামের সঙ্গেও ভিডিওতে বিএনপি ও যুবদলের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত ব্যক্তিদের উপস্থিতির বিষয়ে কথা হয়।
তিনি বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজে ঘটনাটি দেখা যাচ্ছে। এলাকার কিছু তরুণ ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ভিডিওতে থাকা সবার উদ্দেশ্য বা ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত নই।’
পারুলিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম রসুলকে ভিডিওতে দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ সিরাজুল ইসলাম জানান, তিনি ভিডিওতে তাকে দেখেছেন এবং এ বিষয়ে যুবদলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন।
অন্যদিকে সাদিকুল ইসলাম বিএনপির সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেন এই বিএনপি নেতা।
তিনি বলেন, ‘অন্যায়কে কেউ সমর্থন করবেন না। তবে ভিডিওতে উপস্থিতি, রাজনৈতিক পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।’
শামীম হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে ফজলুল হক আমিনীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি আমিনীসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তবে আমিনী ফেসবুকে সক্রিয় রয়েছেন বলে প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। ১৬ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৮ মিনিটে তার প্রোফাইলে একটি পোস্ট দেখা যায়। সেখানে তিনি নিজের কিছু দেনার কথা উল্লেখ করে তা পরিশোধে সহযোগিতা চেয়েছেন।
সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, ‘দুজন ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকিদের গ্রেপ্তার করা হবে। আর ঘটনায় যে যার দলেরই হোক, সেটি বিবেচনা না করে অপরাধী হিসেবেই তাদের বিবেচনা করা হবে।’