গুরুদাসপুরে ৯টি অবৈধ ইটভাটা, প্রশাসনের অভিযানেও বন্ধ হচ্ছে না কার্যক্রম

নাটোরের গুরুদাসপুরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রচলিত আইন অমান্য করে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ও প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়াই চলছে অধিকাংশ ইটভাটা। আবাসিক ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য, কৃষিজমি ও পরিবেশ।
ইট ও মাটি পরিবহনে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাকা সড়কও। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হলেও স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে না অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম।
সরেজমিনে জানা যায়, গুরুদাসপুর উপজেলায় মোট ১১টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটির লাইসেন্স ও ছাড়পত্র রয়েছে। বাকি ৯টি ইটভাটা প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। মালিকরা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এসব ভাটায় ইট উৎপাদন করছেন।
ইটভাটার চিমনির উচ্চতা কম হওয়ায় নির্গত ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে আশপাশের পরিবেশ। এতে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি ইটভাটার ধোঁয়ায় আশপাশের কৃষিজমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ঝুঁকিতে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার মানুষ।
অন্যদিকে, ইট ও মাটি বহনকারী ট্রাক্টর-ট্রলির অবাধ চলাচলে নষ্ট হচ্ছে পাকা সড়ক। তিন ফসলি জমির মাটি কেটে ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ।
জানা যায়, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এর সংশোধিত বিধান অনুযায়ী কৃষিজমি, বনভূমি ও আবাসিক এলাকার আশপাশে ইটভাটা স্থাপন নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার এবং কৃষিজমি, পুকুর, নদী, খাল ও জলাভূমি থেকে মাটি সংগ্রহ করে ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর পুকুর খননের কারণে ১২০ হেক্টর তিন ফসলি জমির পরিমাণ কমেছে। এসব জমিতে ধান, পাট, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের সবজির আবাদ হতো। এর ফলে ধানের উৎপাদন কমেছে প্রায় ১০০ টন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের শেষের দিকে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পরিচালিত এক অভিযানে উপজেলার অনুমোদনহীন ৯টি ইটভাটাকে মোট ২৮ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। তবে এরপরও এসব ইটভাটার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে থাকা ১১টি ইটভাটার মধ্যে পৌর এলাকার আবাসিক অঞ্চলে রয়েছে পাঁচটি। এগুলো হলো—চাঁচকৈড়ের মোশাররফ হোসেনের মেসার্স এমবিপি ব্রিকস, আব্দুস সালাম সবুজের মেসার্স একেবি ব্রিকস, জহুরুল সোনারের মেসার্স এমডিআর ব্রিকস, জাহাঙ্গীর সোনারের মেসার্স এমডিএস ব্রিকস এবং আমজাদ-মফিজের মেসার্স এএমবি ব্রিকস।
এ ছাড়া সাহাপুরে আজাহার প্রামাণিকের মেসার্স এইচবিবি ব্রিকস, আজাহার বালুর মেসার্স এইচআরবি ব্রিকস, কাদের হাজীর মেসার্স এইচকেবি ব্রিকস ও মজনু সরদারের মেসার্স এমএসবি ব্রিকস রয়েছে। হাজীর হাটে জাহিদুল ইসলামের মেসার্স এমডিপি ব্রিকস এবং চন্দ্রপুরে রেজাউল হাসান রানার মেসার্স আরআরবি ব্রিকস অবস্থিত।
স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ রানা, জবতুল্লাহ মন্ডল, জাহের প্রামাণিক, সুজাউদ্দৌলা সুজন, কৃষক রফিকুল ইসলাম ও শফিকুল ইসলামসহ অনেকে বলেন, প্রতিবছরই ইটভাটাগুলোতে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়। কিন্তু প্রশাসনের দায়সারা অভিযানের পর আবারও চালু হয় ভাটাগুলো। তাঁদের দাবি, অবৈধ ইটভাটার কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ইটভাটাগুলোর ভ্যাট, আয়কর, ট্রেড লাইসেন্স, কলকারখানা, বিএসটিআই ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স রয়েছে। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র কারও নেই। ১১টি ভাটার মধ্যে দুটির লাইসেন্স আছে। পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হলে ইটভাটা মালিকদের বিষয়টি জানাতে হবে।’
অন্যদিকে, অনুমোদনপ্রাপ্ত মেসার্স আরআরবি ব্রিকসের মালিক রেজাউল হাসান রানা ও মেসার্স এমডিপি ব্রিকসের মালিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, তাঁরা সরকারি নিয়ম মেনে ইটভাটা পরিচালনা করছেন এবং তাঁদের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র রয়েছে। বাকি ৯টি ইটভাটার কোনো অনুমোদন নেই বলেও দাবি করেন তাঁরা।
এ বিষয়ে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, ‘ইটভাটা পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট আইন রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র বা লাইসেন্সবিহীন ইটভাটার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ভোরের আকাশ/সু.পা