গাছ নয় যেন বিজ্ঞাপনের খুঁটি, যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের সৌন্দর্য বিপর্যস্ত

যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের ঝিকরগাছা অংশে সারিবদ্ধ গাছগুলো দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যম হিসেবে। গাছের কাণ্ডে পেরেক ও বিভিন্ন ধাতব বস্তু ঠুকে টাঙানো হচ্ছে সাইনবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন। এতে একদিকে মহাসড়কের নান্দনিকতা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দীর্ঘদিনের পুরোনো গাছগুলো।
সরেজমিনে ঝিকরগাছা উপজেলা মোড়, হসপিটাল রোড, থানার মোড়, হাজিরালী মহিলা কলেজ মোড়, চারাতলা, গদখালী, নবীবনগর ও নাভারন পুরাতন বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, মহাসড়কের পাশের গাছগুলোর কাণ্ডে পেরেক ঠুকে ঝোলানো হয়েছে নানা ধরনের বিজ্ঞাপন। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন এবং কোচিং সেন্টারের প্রচারণামূলক ব্যানার-ফেস্টুনে অনেক গাছের কাণ্ড ঢেকে গেছে।
কোথাও পুরোনো বিজ্ঞাপনের ওপর নতুন ব্যানার লাগানো হয়েছে, আবার কোনো কোনো গাছে রয়েছে একাধিক পোস্টার ও সাইনবোর্ড। ফলে সবুজে ঘেরা মহাসড়কের স্বাভাবিক সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গাছকে বিজ্ঞাপনের খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হলেও এ বিষয়ে কার্যকর ও নিয়মিত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তাদের দাবি, শুধু বিজ্ঞাপন অপসারণ নয়, গাছে পেরেক ঠুকে বিজ্ঞাপন লাগানোর প্রবণতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
পরিবেশসংশ্লিষ্টদের মতে, গাছের কাণ্ডে পেরেক বা ধাতব বস্তু প্রবেশ করালে সেখানে ক্ষত সৃষ্টি হয়। ওই ক্ষত দিয়ে পানি ও জীবাণু প্রবেশ করে গাছের ভেতরে পচন ধরতে পারে। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে গাছের স্থায়িত্বও কমে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন, ২০২৬-এর ৯(১৩) ধারা অনুযায়ী বাণিজ্যিক উৎপাদন ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে গাছে পেরেক মারা নিষিদ্ধ। একই আইনের ১০(৩) ধারায় এ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইন থাকলেও এর যথাযথ প্রয়োগ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তারা দ্রুত অভিযান চালিয়ে গাছ থেকে অবৈধ বিজ্ঞাপন অপসারণ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বন অধিদপ্তরের ডেপুটি রেঞ্জার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আরিফুল আলম বলেন, গাছে পেরেক দেখলে তা তুলে ফেলার নির্দেশনা রয়েছে। ঝিকরগাছা প্রশাসনের সঙ্গে সভায় বিষয়টি তুলে ধরে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া পৌরসভাও চাইলে এগুলো সরাতে পারে।
গাছগুলোর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা যশোর জেলা পরিষদের সার্ভেয়ার এম. এ. মনজু বলেন, গাছে পেরেক মারা অপরাধ এবং বিষয়টি তাঁরা অবগত। তবে জনবল সংকট ও ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকায় সরাসরি অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না। উপজেলা প্রশাসন বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে পারেন।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (চঃদাঃ) মো. আওয়াল-উর-রহমান জানান, গাছগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জেলা পরিষদের। তবে বিষয়টি নিয়ে উপজেলা প্রশাসন সমন্বয় করতে পারে।
ঝিকরগাছার সহকারী কমিশনার (ভূমি), নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পৌর প্রশাসক শপথ বৈরাগী বলেন, “আমি নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েছি। পৌরসভায় আলোচনা করে এ বিষয়ে দ্রুত সমাধান ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগে মহাসড়কের গাছ থেকে বিজ্ঞাপন অপসারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে গাছে পেরেক ঠুকে কোনো ধরনের প্রচারণা চালানো বন্ধ করা হবে। এতে রক্ষা পাবে মহাসড়কের সবুজ সৌন্দর্য এবং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী গাছগুলোও।
ভোরের আকাশ/ এনউব