ধানের ক্ষেত থেকে বিচারকের আসনে আলমডাঙ্গার আনারুল

এক হাতে কৃষিকাজ, অন্য হাতে বই। জীবিকার প্রয়োজনে মাঠে কাজ করার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছেন।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট আনারুল ইসলাম। অভাব-অনটন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও থেমে থাকেননি। দীর্ঘ সংগ্রাম ও অধ্যবসায়ের পর ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী জজ (সিভিল জজ/জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কালিদাসপুর ইউনিয়নের চর শ্রীরামপুর গ্রামের মো. আনারুল ইসলাম।
মো. আনারুল ইসলাম ওই গ্রামের মৃত হারেজ মোল্লার কনিষ্ঠ সন্তান। শৈশবেই বাবাকে হারানোর পর পরিবারের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছেন তিনি। বড় ভাইয়ের সঙ্গে জীবিকার প্রয়োজনে কৃষিকাজ করেছেন। তবে কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। কৃষিকাজ ও পড়াশোনার মধ্যে সমন্বয় করে এগিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
আনারুলের এই সাফল্য শুধু একটি চাকরিতে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা নয়; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেও শিক্ষার প্রতি তাঁর দৃঢ়তা ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল। মাঠে কাজ শেষে বই নিয়ে বসা কিংবা সীমিত সুযোগের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অভ্যাস তাঁকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নেয়।
শিক্ষাজীবনে আনারুল জগন্নাথপুর-শ্রীরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি সম্পন্ন করেন। পরে আলমডাঙ্গা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং আলমডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তাঁর লক্ষ্য ছিল নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে বিচার বিভাগে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে ১৮তম বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করেন। দীর্ঘ প্রস্তুতি ও পরিশ্রমের পর চূড়ান্ত ফলাফলে তাঁর নাম আসে। এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবার, স্বজন, শিক্ষক, বন্ধু ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়।
নিজের সাফল্যের জন্য মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া প্রকাশ করেছেন আনারুল। একই সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে যারা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে সহোদর আমজাদ হোসেনের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেন।
আনারুল তাঁর শিক্ষাজীবনের অন্যতম অনুপ্রেরণাদাতা হিসেবে প্রভাষক খাইরুল ইসলামের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, প্রাথমিক পর্যায় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত খাইরুল ইসলাম তাঁকে একাডেমিক ও মানসিকভাবে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তাঁর ব্যক্তিগত লাইব্রেরির বই পড়ার সুযোগ আনারুলের জ্ঞানচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিজেএস পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় হলের রুমমেট ও ক্যাম্পাসের বন্ধু মাহমুদ হাসান, সোহেল, সাজু, মিলন, গোলাম মোস্তফা ও আরাফাতের সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন তিনি। পাশাপাশি শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের অবদানও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন আনারুল।
আনারুলের সাফল্যে খুশি তাঁর পরিবার ও এলাকাবাসী। তাঁদের মতে, শৈশবে বাবাকে হারিয়ে অভাবের মধ্যে বড় হওয়া এবং কৃষিকাজের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আনারুলের সাফল্য এলাকার তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণার।
আনারুল ইসলামের এই সাফল্যে তাঁর পরিবার, শিক্ষক, বন্ধু, স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা অভিনন্দন জানিয়েছেন। ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে বিচার বিভাগের দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁর প্রতি শুভকামনা জানিয়েছেন তাঁরা।
কৃষকের মাঠ থেকে আইন বিভাগের পাঠ, সেখান থেকে বিচার বিভাগের দায়িত্ব—আনারুল ইসলামের দীর্ঘ পথচলায় রয়েছে সংগ্রাম, অধ্যবসায় ও স্বপ্নপূরণের গল্প।
ভোরের আকাশ/ এনউব