পেটের দায়ে লাশ বহন
৩৫ বছরের এক অজানা লড়াই ছকু মিয়ার

লাশ শব্দটি শুনলেই অনেকের শরীর শিউরে ওঠে। মৃত্যুর গন্ধ, নিথর দেহ, চারপাশে নেমে আসা নীরবতা এসব থেকে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই দূরে থাকতে চায়। কিন্তু পেটের দায়ে কেউ যদি এই লাশকেই জীবিকার মাধ্যম বানায়, তবে সেই জীবন কতটা কঠিন তা সহজে কল্পনা করা যায় না।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামে বসবাস করা ৭০ বছর বয়সী ছকু মিয়া ঠিক তেমনই এক মানুষ। গত ৩৫ বছর ধরে তিনি জেলার বিভিন্ন এলাকায় লাশ বহনের কাজ করে আসছেন। গাইবান্ধা সদর উপজেলা, পলাশবাড়ী উপজেলা, সাঘাটা উপজেলা ও ফুলছড়ি উপজেলাএই চার উপজেলায় কোনো অপমৃত্যু ঘটলেই সবার আগে ডাক পড়ে তার। এভাবেই তিনি সবার কাছে পরিচিত হয়েছেন ‘লাশ টানা ছকু’ নামে।
পুলিশের ফোন এলেই সময়-অসময় না দেখে ভ্যান নিয়ে ছুটে যান ছকু মিয়া। কখনো গভীর রাতে ফাঁসিতে ঝুলন্ত মরদেহ নামাতে, কখনো আবার কয়েকদিন পড়ে থাকা পচাগলা লাশ বহন করতে। আদালতের নির্দেশে কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো সব কাজেই তার অভিজ্ঞতা ও সাহসই ভরসা হয়ে ওঠে।
ছকু মিয়া বলেন, শুরুতে এই কাজ করতে গিয়ে প্রচণ্ড ভয় লাগত। রাতের ঘুম হারাম হয়ে যেত। কিন্তু সংসারের দায় মানুষকে অনেক কিছুই শিখিয়ে দেয়। এখন পচা, গলিত বা দুর্গন্ধযুক্ত লাশও আর আগের মতো ভয় দেখায় না সবই যেন জীবনের অংশ হয়ে গেছে তার কাছে।
এই কাজের পারিশ্রমিকও খুব বেশি নয়। একটি লাশ বহন করে মর্গে পৌঁছে দিলে তিনি পান তিন থেকে চার হাজার টাকা। আর কবর খুঁড়ে লাশ উত্তোলনের জন্য পান প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার টাকা। তবে কাজ না থাকলে আয়ও নেই। অনেক সময় পুরো মাস কেটে যায় কোনো ফোন না আসায়, তখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটে তার।
কথা হয় ছকু মিয়ার স্ত্রী রেখা বেগমের সঙ্গে। তিনি অভিমান আর অভিযোগ করে প্রতিবেদককে বলেন, দীর্ঘ ৩৫ বছর এই কঠিন পেশায় যুক্ত থাকার কারণে অন্য কোনো কাজ শেখার সুযোগ হয়নি তার। ফলে পরিবারকে নিয়ে এখনো দারিদ্র্যের সঙ্গেই লড়াই করে যেতে হচ্ছে। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা তেমন একটা ভালো নেই। তাই কষ্টে দিন কাটছে আমাদের।
স্থানীয় যুবক জিহাদ হাসান রিদয় বলেন, আমরা ছোট থেকেই দেখছি ছকু দাদা এই ভ্যানে করে লাশ পরিবহন করে আসছে। আর রাস্তার সঙ্গে সেই ২-৩ শতাংশ জমির উপরে যে দোচালা টিনের বাড়ি সেই বাড়িই রয়ে গেছে। তার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটে নি। বর্তমানে টাকার অভাবে কষ্টেই দিন কাটছে তার পরিবারের।
আরেক স্থানীয় যুবক আলিফ মিয়া বলেন, সমাজের সবচেয়ে কঠিন ও সংবেদনশীল মুহূর্তে যাঁর প্রয়োজন পড়ে, সেই মানুষটিই এখনো সরকারি কোনো সহায়তা বা স্বীকৃতি পাননি। পুলিশের কাছে তার ফোন নম্বর থাকলেও কোনো তালিকায় নেই তার নাম। তাই সরকারি ভাবে তাকে ভাতার আওতায় আনা গেলে অনেকটাই কষ্ট লাঘব হবে তার।
এ বিষয়ে বল্লমঝাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুলফিকার রহমান ভোরের আকাশকে বলেন, আমি চেয়রাম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরে তাকে বয়ষ্ক ভাতা করে দিয়েছে। কয়েকমাস আগেও তাকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাকে একটি বাথরুমে ব্যবস্থা করে দিয়েছি। তাছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে থেকে সর্বাত্রক সহযোগিতা করা হবে ছকু মিয়াকে।
মৃত্যুর সঙ্গে প্রতিদিন বসবাস করেও জীবনের লড়াই থামাননি ছকু মিয়া। মানুষের শেষ যাত্রার নীরব সঙ্গী হয়ে ৩৫ বছর দায়িত্ব পালন করেও তিনি আজও রয়ে গেছেন অবহেলার আড়ালে। সমাজের এই প্রয়োজনীয় মানুষটির পাশে দাঁড়ানোর দাবি এখন জোরালো হয়ে উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যেই।
ভোরের আকাশ/ র.ই