কুষ্টিয়ায় তিন দিনব্যাপী লালন স্মরণোৎসবের উদ্বোধন

‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’—বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের এই আধ্যাত্মিক বাণীকে ধারণ করে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী ঐতিহাসিক লালন স্মরণোৎসব। লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
উদ্বোধন উপলক্ষে লালন একাডেমির মূল মঞ্চে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. রশিদুন নবী।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী এবং সংরক্ষিত নারী আসন-৩০৬-এর সংসদ সদস্য মোছা. ফরিদা ইয়াসমীনসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা।
আলোচনা সভা শেষে মূল মঞ্চে লালন একাডেমির শিল্পীরা ফকির লালন শাহের আধ্যাত্মিক গান পরিবেশন করেন। তাঁদের পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ। লালনের মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আত্মশুদ্ধির বাণীকে কেন্দ্র করে উৎসবে ভক্ত-অনুরাগীদের মধ্যে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লালন একাডেমি এ স্মরণোৎসবের আয়োজন করেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও লালন শাহের দর্শন ও আধ্যাত্মিক সাধনার তাৎপর্য উপলব্ধি করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন হাজারো লালন অনুসারী, সাধু-ফকির, ভক্ত-অনুরাগী ও দর্শনার্থী। তাঁদের পাশাপাশি বিদেশি লালনভক্তদের উপস্থিতিতেও মুখর হয়ে উঠেছে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি।
উৎসবকে ঘিরে আখড়াবাড়ি চত্বরে কালী নদীর তীরবর্তী মাঠে বসেছে বিশাল লালন মেলা। মেলায় বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। উৎসবের আমেজে আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য।
এদিকে, স্মরণোৎসব নির্বিঘ্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা। পুরো আয়োজনস্থল সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনার পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
আয়োজকদের সূচি অনুযায়ী, আগামীকাল রোববার দুপুরে বাউলদের আনুষ্ঠানিক পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে তিরোধান দিবসের মূল আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে। তবে লালন একাডেমির মূল মঞ্চে গান ও আলোচনা সভার আয়োজন চলবে আরও এক দিন।
উল্লেখ্য, বাংলা ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পয়লা কার্তিক আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালন শাহের তিরোধানের পর থেকে তাঁর অনুসারীরা প্রতিবছর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে এ স্মরণোৎসবের আয়োজন করে আসছেন। কালক্রমে এই আয়োজন পরিণত হয়েছে বাংলার লোকসংস্কৃতি, বাউল সাধনা ও মানবতাবাদী দর্শনের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলায়।
ভোরের আকাশ/ এনউব