শিরোনাম
বিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রীবিদেশি সহায়তা নয়, বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে নতুন বোর্ড গঠনের উদ্যোগবাংলাদেশে হামের প্রকোপ ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ও পোলিও প্রাদুর্ভাবের ‘সতর্কতা’শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়লেও কমেছে শিক্ষার্থীবিদেশি ঋণ কমেছে ৪২.৩৪%, ছয় উন্নয়ন সহযোগীর প্রতিশ্রুতি নেইকক্সবাজারে আগুন: ডিএনএ পরীক্ষায় নিহত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত, এখনো নিখোঁজ ১অনলাইন টিকিটের কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ কঠিন: রেলমন্ত্রীনিপ্পন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের নৈশভোজে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

গাইবান্ধার নজরুলের ‘কাটিং পদ্ধতিতে’ বাঁশ চাষ : একটি বাঁশে ৬০ বাঁশঝাড়

রিফাতুন্নবী রিফাত,গাইবান্ধা প্রতিনিধি

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪:২৮ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ছবি- ভোরের আকাশ
ছবি- ভোরের আকাশ

একটি বাঁশ থেকে সাধারণত একটি বাঁশঝাড় তৈরি হয়। কিন্তু সেই একটি বাঁশ থেকেই যদি তৈরি করা যায় ৬০টি পর্যন্ত নতুন বাঁশঝাড়, তাহলে তা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ। দীর্ঘদিনের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবনের দাবি করেছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়ার সাবেক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম।

তার উদ্ভাবিত ‘কাটিং পদ্ধতি’ ব্যবহার করে একটি বাঁশ থেকে সর্বোচ্চ ৬০টি পর্যন্ত নতুন বাঁশঝাড় তৈরি করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন তিনি। ইতোমধ্যে গাইবান্ধার গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকেরাও এ পদ্ধতিতে বাঁশ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।

নজরুল ইসলামের এই গবেষণার শুরু প্রায় ছয় দশক আগে। ১৯৬৮ সালে তিনি যখন হাইস্কুলের ছাত্র, তখন তাঁর দাদা মারা যান। দাফনের জন্য প্রয়োজন হয় বাঁশের। কিন্তু নিজেদের কোনো বাঁশঝাড় না থাকায় অন্যের কাছ থেকে বাঁশ সংগ্রহ করতে হয়েছিল তাদের।

সেদিনের সেই অভিজ্ঞতা কিশোর নজরুলের মনে গভীর দাগ কাটে। তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, বাঁশের দ্রুত ও সহজ বংশবিস্তারের কোনো উপায় বের করা যায় কি না। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ গবেষণা।

প্রায় ১১ বছর একটানা চেষ্টা করেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি তিনি। একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন, আবার ব্যর্থও হয়েছেন। তবে ব্যর্থতায় থেমে যাননি। একসময় তাঁর মনে হয়, বাঁশকে দাঁড় করিয়ে না রেখে যদি শুইয়ে দিয়ে বংশবিস্তার করা যায়, তাহলে হয়তো নতুন কিছু পাওয়া সম্ভব।

এরপর শুরু হয় নতুন পদ্ধতিতে পরীক্ষা। সেখান থেকেই আসে সাফল্য। বাঁশের একটি অংশ মাটিতে লাগানোর পর সেখান থেকে নতুন চারা গজাতে শুরু করে। ধীরে ধীরে সেই কাটিং থেকেই তৈরি হতে থাকে নতুন বাঁশঝাড়।

নজরুল ইসলামের দাবি, প্রায় এক যুগের গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি বাঁশের এই বংশবিস্তার পদ্ধতিতে সফল হন। বালুমাটিতেও বাঁশ চাষে সাফল্য পাওয়ার পর তাঁর গবেষণা আরও বিস্তৃত হয়। বাঁশের বিভিন্ন জাত ও বিভিন্ন ধরনের মাটিতে এর বেড়ে ওঠা নিয়েও তিনি পরীক্ষা চালান।

তাঁর গবেষণায় দেখা গেছে বলে তিনি জানান, উর্বর মাটির তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে বালুমাটিতেও বাঁশ ভালোভাবে বেড়ে উঠতে পারে। ফলে পতিত জমি, বালুমাটি কিংবা নদীর তীরবর্তী অনাবাদি জমিতেও বাঁশ চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষ করে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার অনাবাদি বালুচরে বাঁশ চাষ করা গেলে একই সঙ্গে জমির ব্যবহার বাড়ানো ও কৃষকের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নজরুল ইসলামের উদ্ভাবিত কাটিং পদ্ধতি এখন আর শুধু গাইবান্ধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর কাছ থেকে পদ্ধতিটি জেনে চাঁদপুর, কুমিল্লা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা বাঁশ চাষ করছেন বলে জানা গেছে।

কৃষকদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো তুলনামূলক কম জায়গা ও কম খরচে দ্রুত বাঁশঝাড় তৈরি করা যায়। ফলে বাণিজ্যিকভাবে বাঁশ চাষে এ পদ্ধতি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তা ও কৃষকেরা।

নজরুল ইসলামের দাবি, তাঁর উদ্ভাবিত কাটিং পদ্ধতিতে বাঁশের চারা পাওয়ার হার প্রায় শতভাগ। বিপরীতে সনাতন পদ্ধতিতে চারা পাওয়ার হার প্রায় ৬০ শতাংশ।

তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য উৎপাদনের পরিমাণে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, সনাতন পদ্ধতিতে একটি বাঁশ থেকে যেখানে একটি বাঁশঝাড় তৈরি করা যায়, সেখানে কাটিং পদ্ধতিতে একটি বাঁশ থেকে সর্বোচ্চ ৬০টি পর্যন্ত বাঁশঝাড় তৈরি করা সম্ভব।

তাঁর মতে, এ পদ্ধতিতে বড় জমিতে বাণিজ্যিকভাবে বাঁশ চাষের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে অনাবাদি জমিকে উৎপাদনশীল করে কৃষকের আয় বাড়ানো সম্ভব।

যেভাবে করতে হয় কাটিং
নজরুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কাটিং পদ্ধতিতে বাঁশ লাগানোর উপযুক্ত সময় আশ্বিন-কার্তিক মাস। এ জন্য প্রথমে বাঁশঝাড় থেকে এক থেকে দুই বছর বয়সী একটি বাঁশ বেছে নিতে হয়।

এরপর বাঁশের গিঁড়ার সঙ্গে থাকা কঞ্চিগুলো প্রায় এক ইঞ্চি রেখে বাকিটা কেটে ফেলতে হয়। পরে করাত দিয়ে দুই গিঁড়ার মাঝ বরাবর বাঁশ কেটে তৈরি করা হয় কাটিং। নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ওষুধ মিশ্রিত পানিতে কাটিংগুলো ভিজিয়ে জমিতে লাগানো হয়।

জমিতে কাটিং লাগানোর সাত দিন পর প্রথম সেচ দিতে হয়। এরপর ১৫ দিন পর ও এক মাস পর আরও দুই দফা সেচ দেওয়ার কথা জানান তিনি। বাঁশের শিকড় মাটিতে ভালোভাবে ছড়িয়ে গেলে নিয়মিত সেচের প্রয়োজন হয় না। বাঁশ দ্রুত লম্বা ও মোটা করতে বছরে একবার ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয়।

নজরুল ইসলামের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে বাঁশ চাষ করে প্রতি বিঘা জমি থেকে বছরে প্রায় এক থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।

তাঁর মতে, বাঁশের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—একবার একটি বাঁশঝাড় তৈরি হলে সেখান থেকে বছরের পর বছর বাঁশ পাওয়া যায়। সময়ের সঙ্গে বাঁশঝাড়ের আকার বাড়তে থাকে, একই সঙ্গে বাড়ে উৎপাদন ও সম্ভাব্য আয়ও। তবে প্রকৃত আয় নির্ভর করবে বাঁশের জাত, জমির ধরন, পরিচর্যা, উৎপাদন ও স্থানীয় বাজারদরের ওপর।

পেয়েছেন স্বীকৃতিও
বাঁশের বংশবিস্তারে নতুন এই পদ্ধতি নিয়ে কাজের স্বীকৃতিও পেয়েছেন নজরুল ইসলাম। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বীকৃতির পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়েও পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি। তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল রোটারি পুরস্কার ও জাতীয় কৃষি পদক।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও নদীর তীরবর্তী বালুমাটিতে বাঁশ চাষের সম্ভাবনা দেখছেন। তাদের মতে, অনাবাদি বালুচর ও নদীর তীরবর্তী জমিতে বাঁশের চাষ বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন পতিত জমির ব্যবহার বাড়বে, অন্যদিকে বাঁশের শিকড় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখায় নদীভাঙন মোকাবিলায়ও এটি সহায়ক হতে পারে।

এ বিষয়ে গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রোস্তম আলী বলেন, “নদীর তীরবর্তী বালুমাটিতে বাঁশ চাষ বাড়ানো গেলে অনাবাদি জমির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি মাটি ধরে রাখার ক্ষেত্রেও বাঁশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে চান পদ্ধতি
দীর্ঘদিনের গবেষণার ফল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন নজরুল ইসলামের স্বপ্ন। বিশেষ করে পতিত ও অনাবাদি জমিকে বাঁশ চাষের আওতায় এনে কৃষকের আয় বাড়াতে চান তিনি।

আরও পড়ুন

রূপগঞ্জে চাকরির ভুয়া বিজ্ঞাপনে ১০ যুবক অপহরণ, গ্রেপ্তার ২

একটি বাঁশ থেকে একটি নয়, সর্বোচ্চ ৬০টি পর্যন্ত বাঁশঝাড় তৈরির দাবি যদি বৃহৎ পরিসরে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়, তাহলে কম খরচে বাঁশের বংশবিস্তারের পাশাপাশি বাণিজ্যিক চাষেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

পতিত জমির ব্যবহার, কৃষকের বাড়তি আয়, বালুমাটিতে উৎপাদনের সম্ভাবনা ও নদীর তীর রক্ষায় সম্ভাব্য ভূমিকা—সব মিলিয়ে বাঁশের এই কাটিং পদ্ধতি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভোরের আকাশ/সু.পা

শেয়ার করুন: