মাদক-ছিনতাই-চাঁদাবাজি ঠেকাতে কড়া নির্দেশ সিএমপির

চট্টগ্রাম মহানগরে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে চুরি, ছিনতাই, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে জোরালো ও কার্যকর অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। একই সঙ্গে তিনি পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে সর্বোচ্চ সততা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের মাল্টিপারপাস শেডে অনুষ্ঠিত সিএমপির জুলাই-২০২৬ মাসের মাসিক কল্যাণ সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব নির্দেশনা দেন।
সভায় পুলিশ কমিশনার বলেন, নগরবাসীর জানমাল রক্ষা এবং নিরাপদ নগর গড়ে তুলতে পুলিশ সদস্যদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমেও গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি এবং কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল কার্যক্রম আরও জোরদার করার নির্দেশ দেন তিনি।
তিনি বলেন, পুলিশের প্রতি মানুষের আস্থা ধরে রাখতে হলে প্রতিটি সদস্যকে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে হবে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতি বা অনিয়ম গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের সঙ্গে মানবিক আচরণ বজায় রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, চট্টগ্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও বন্দরনগরী। এখানে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা শুধু নাগরিক নিরাপত্তার জন্যই নয়, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্ন রাখার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই অপরাধ দমনে প্রতিটি ইউনিটকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভায় কিশোর গ্যাং কার্যক্রম নিয়ে বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। কমিশনার বলেন, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা রোধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে। স্থানীয় জনগণ, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
মাদকবিরোধী অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, মাদক সমাজের জন্য একটি বড় হুমকি। মাদকের বিস্তার রোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই এ বিষয়ে শিথিলতা দেখানো যাবে না।
চুরি, ছিনতাই ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থানা পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ এবং টহল টিমগুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশ দেন তিনি। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারি চালানোরও আহ্বান জানান।
কল্যাণ সভায় বাহিনীর সদস্যদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের কল্যাণ ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়। পুলিশ সদস্যদের বিভিন্ন সমস্যা, প্রয়োজনীয়তা ও কল্যাণমূলক বিষয় শুনে তা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন কমিশনার।
সভায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের জন্য সিএমপির কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন জনিকে সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করা হয়। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় এশিয়ান প্যারা থ্রোবল চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬-এ রেফারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন করেন।
এছাড়া ভারতের ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সাউথ এশিয়ান থ্রোবল চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬-এ বাংলাদেশ দলের হয়ে খেলোয়াড় হিসেবে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই সাফল্যের জন্য পুলিশ কমিশনার তাকে অভিনন্দন জানান এবং ভবিষ্যতেও ক্রীড়া ও পেশাগত ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে উৎসাহিত করেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (প্রশাসন ও অর্থ) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া (অতিরিক্ত ডিআইজি), উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) মো. ফেরদৌস আলী চৌধুরী, উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. হাবিবুর রহমান প্রাং, উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি-দক্ষিণ) শেখ শরীফুল ইসলাম, উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) নেছার উদ্দিন আহম্মেদসহ সিএমপির বিভিন্ন ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন স্তরের পুলিশ সদস্যরা।
মাসিক কল্যাণ সভা শেষে পুলিশ কমিশনার আবারও জোর দিয়ে বলেন, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সিএমপির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এজন্য প্রতিটি পুলিশ সদস্যকে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনবান্ধব পুলিশিং নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধ দমনে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি এবং জনগণের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও অপরাধমুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলার লক্ষ্যে সিএমপি কাজ করে যাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ভোরের আকাশ/এনউব