অর্থ সংগ্রহ
ঝিকরগাছায় মাদ্রাসার অর্থ সংগ্রহ ও ভবন নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার পদ্মপুকুর গ্রামের হাসপাতাল রোডে অবস্থিত রওজাতুল জান্নাত বালিকা হাফিজিয়া মাদ্রাসার অর্থ সংগ্রহ, জমির মালিকানা, ভবন নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের খাবার ও আবাসনব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাদ্রাসার উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের আবাসন ও অন্যান্য প্রয়োজনের কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব জমি নেই। মাদ্রাসাটি যে জমিতে পরিচালিত হচ্ছে, সেটি পরিচালক আব্দুর রহমানের স্ত্রী রুবিনা খাতুনের নামে। এ অবস্থায় মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য সংগৃহীত অর্থের ব্যবহার এবং নির্মাণাধীন ভবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়দের কেউ কেউ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালে টিনের ছাউনিযুক্ত দুই কক্ষের একটি ঘরে মাদ্রাসাটির কার্যক্রম শুরু হয়। কয়েক বছরের ব্যবধানে সেখানে তিনতলা ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত বসবাসের উপযোগী করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও দুই শতক জমি কেনা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে জমির মালিকানা ও ভবিষ্যতে স্থাপনাটির ব্যবহার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, কোনো কারণে মাদ্রাসার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে ভবনটি ব্যক্তিগত আবাসন হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন অভিভাবক। তাঁদের দাবি, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য মাসে তিন হাজার টাকা নেওয়া হলেও আবাসন ও খাবারের মান প্রত্যাশিত নয়। সন্তানদের লেখাপড়া ও আবাসনের ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করার আশায় অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
মাদ্রাসার পরিচালক আব্দুর রহমানের দাবি, সপ্তাহে দুই দিন সকালে শিক্ষার্থীদের খিচুড়ি এবং বাকি পাঁচ দিন আলুভর্তা ও ডাল দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিদিন দুপুরে মাছ, মাংস কিংবা ডিমের যেকোনো একটি পরিবেশনের কথা রয়েছে।
তবে গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) সরেজমিন পরিদর্শনে দুপুরের খাবারের জন্য ভাত, মিষ্টিকুমড়ার ঘণ্ট ও পাতলা ডাল রান্না হতে দেখা যায়। নির্ধারিত খাবারের তালিকা ও বাস্তবে পরিবেশিত খাবারের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
মাদ্রাসার পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়েও এর আগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো একটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, অর্থ সংগ্রহ ও সামগ্রিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মাদ্রাসাটির বিরুদ্ধে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঝিকরগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে আহ্বায়ক করা হয়েছে। অন্য দুই সদস্য হলেন উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।
তদন্ত কমিটি অভিযোগগুলো যাচাই করে কী প্রতিবেদন দেবে, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের। তবে তদন্তের ফলাফল কিংবা অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার আগে কোনো পক্ষকে দায়ী করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হলে সেই অর্থের স্বচ্ছ ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। মাদ্রাসার জমির মালিকানা, ভবন নির্মাণে অর্থের উৎস ও ব্যয়, পরিচালনা কমিটির কাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের খাবার ও আবাসনব্যবস্থা—সব বিষয়ই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং শিক্ষার্থী ও দাতাদের স্বার্থ সুরক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভোরের আকাশ/ এনউব