বড়পুকুরিয়া খনি সম্প্রসারণের আগেই কৃষিজমিতে শত শত বহুতল ভবন

দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সম্প্রসারণের আগেই দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ উর্বর কৃষিজমিতে নির্মাণ করা হয়েছে শত শত বহুতল ভবন। অভিযোগ উঠেছে, ভবিষ্যতে অধিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এসব ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি প্রশাসনের প্রাথমিক তদন্তে অন্তত ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ। এর আগে বড়পুকুরিয়া কয়লার লুটপাটের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনে ২৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অর্থের বিনিময়ে কেউ কেউ মামলা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে খনি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে খনিটিকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তির মতো ব্যবহার এবং প্রতিবছর কয়লা খনির মুনাফার বোনাস নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অথচ খনি এলাকার অনেক মানুষ বাড়িঘর ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।
সরেজমিনে পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি মৌজায় গিয়ে দেখা যায়, একসময় যেসব জমিতে ধান, গম ও ভুট্টার আবাদ হতো, সেসব জায়গায় এখন সারি সারি তিন ও চারতলা ভবন দাঁড়িয়ে আছে। অধিকাংশ ভবনেই কোনো বসবাস নেই। অনেক ভবনে বিদ্যুৎ, পাকা সড়ক, ড্রেনেজসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধাও নেই। বেশ কিছু ভবনের প্রধান ফটকে ঝুলছে তালা। স্থানীয়দের ভাষায়, এসব ভবন এখন ‘ভুতুড়ে বাড়ি’।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড (বিসিএমসিএল) খনি সম্প্রসারণের জন্য নতুন করে জমি অধিগ্রহণের নীতিগত অনুমোদন পাওয়ার পরই ক্ষতিপূরণের আশায় কৃষিজমিতে দ্রুত বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়। এ কাজে খনির কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্থানীয় দালালচক্র ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে।
উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক জরিপে খনির অন্তত ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের কেউ বেনামে, আবার কেউ দালালের মাধ্যমে এসব ভবনে বিনিয়োগ করেছেন। একই ব্যক্তিরা একাধিকবার অধিগ্রহণের অর্থ গ্রহণ করছেন—এমন অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, অধিকাংশ ভবনই অনুমোদনহীন এবং বিল্ডিং কোড না মেনেই নির্মাণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকার জমির খাজনা গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, উর্বর কৃষিজমিতে এভাবে অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহ আলম বলেছেন, তদন্তে কোনো কর্মকর্তা ব্যক্তিগত স্বার্থে ভবন নির্মাণে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, অধিগ্রহণের আগেই যারা এভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেছেন, জমি অধিগ্রহণ করা হলে ইতিপূর্বে আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মৌজাগুলোও এর আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ সরাসরি প্রকৃত ভূমির মালিকদের হাতে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, ভূমি হারানো পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগ, এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে খনি কর্তৃপক্ষ নানা টালবাহানা করছে।
ভোরের আকাশ/সু.পা