চট্টগ্রামে পিতাকে হত্যার দ্বায়ে ছেলে গ্রেপ্তার

চট্টগ্রামে সম্পত্তি ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তিকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় প্রায় দুই বছর পর চাঞ্চল্যকর তথ্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
সংস্থাটির তদন্তে উঠে এসেছে, সম্পত্তির লোভ ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে পরিকল্পিতভাবে বাবাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে বেলাল হোসেন (৩৫) এবং তার সহযোগী আব্দুল জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এছাড়া হত্যাকাণ্ডে সহায়তাকারী হিসেবে এক নারীর সম্পৃক্ততার তথ্যও পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা, যদিও তাকে এখনও আটক করা সম্ভব হয়নি।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, নিহত মীর মজিবুর রহমান খান (৬০) পেশায় একজন বাবুর্চি ছিলেন। তার বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পূর্ব চাম্বল এলাকায়। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, জমি বিক্রি, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা এবং পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েনকে কেন্দ্র করে বড় ছেলে বেলালের সঙ্গে তার দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
তদন্তকারীদের ধারণা, এই বিরোধই শেষ পর্যন্ত হত্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের জুন মাসে। সে সময় মজিবুর রহমান ফটিকছড়ি থেকে চট্টগ্রাম নগরে তার মেয়ে সালমা খানমের বাসায় বেড়াতে আসেন। পরে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও কোনো সন্ধান না পেয়ে তার মেয়ে প্রথমে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে অপহরণ মামলা দায়ের করা হলে তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, তদন্তে জানা যায়, অভিযুক্ত বেলাল হোসেন পূর্বপরিকল্পিতভাবে এক পরিচিত নারীকে ব্যবহার করে তার বাবার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেন। সেই নারীর মাধ্যমে মজিবুর রহমানকে চট্টগ্রাম নগরের বাকলিয়া এলাকার একটি বাসায় ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন বেলালের সহযোগী আব্দুল জলিল।
তদন্ত অনুযায়ী, বাসায় পৌঁছানোর পর মজিবুর রহমানকে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। কিছুক্ষণ পর তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাকে একটি যানবাহনে করে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরানো হয়, যাতে সন্দেহ সৃষ্টি না হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে তাকে হালিশহর এলাকার সিডিএ আউটার রিং রোডসংলগ্ন নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে। হত্যার পর মরদেহ পাশের ঝোপে ফেলে রেখে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে অভিযুক্তরা।
পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রোর পুলিশ সুপার এস এম রফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ তদন্ত, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে মামলার রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্য ও পূর্বে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত মরদেহের আলামতের মধ্যে মিল পাওয়া গেছে।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. আজমগীর জানান, গত ১৩ জুন কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জারটেক এলাকা থেকে বেলাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন জোরারগঞ্জ এলাকার ঘেড়ামারা থেকে সহযোগী আব্দুল জলিলকে আটক করা হয়।
পিবিআই আরও জানায়, হত্যার দুই দিন পর অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৯ জুন হালিশহর থানা পুলিশ একটি অজ্ঞাত পরিচয়ের মরদেহ উদ্ধার করেছিল। পরিচয় শনাক্ত করতে না পারায় ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ দাফন করা হয় এবং মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি না হওয়ায় পরে চূড়ান্ত প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছিল।
তবে নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, পারিবারিক সদস্যদের বক্তব্য এবং আসামিদের স্বীকারোক্তি বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ওই অজ্ঞাত মরদেহটিই ছিল নিখোঁজ মজিবুর রহমান খানের।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বর্তমানে অনেক অপরাধের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত আইনগতভাবে নিষ্পত্তি করা, পারিবারিক মধ্যস্থতা জোরদার করা এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা বাড়ানো গেলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
বর্তমানে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আদালতের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হয়েছে। পলাতক নারী সহযোগীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে এবং মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশা, মামলার বাকি দিকগুলোও দ্রুত উন্মোচিত হবে এবং জড়িত সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হবে।
ভোরের আকাশ/ র.ই