শিরোনাম
সরানো হলো এসআরবি প্রধানকেনারায়ণগঞ্জে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভদুই মহাসড়ক অচল: শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া-সংঘর্ষ, আহত ৩০পদ্মা-যমুনায় দ্বিতীয় সেতু ও ব্যারেজ নির্মাণ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীরচারদিন গ্যাস বন্ধের খবর গুজব: পেট্রোবাংলাশাহজালাল রুমিকে চার সপ্তাহের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ আদালতেরগ্রীষ্মের আগে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা সরকারের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রীনেপালে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে ভারতীয় নাগরিক নিহতসরানো হলো এসআরবি প্রধানকেনারায়ণগঞ্জে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, সড়কে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভদুই মহাসড়ক অচল: শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া-সংঘর্ষ, আহত ৩০পদ্মা-যমুনায় দ্বিতীয় সেতু ও ব্যারেজ নির্মাণ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীরচারদিন গ্যাস বন্ধের খবর গুজব: পেট্রোবাংলাশাহজালাল রুমিকে চার সপ্তাহের মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ আদালতেরগ্রীষ্মের আগে ৩-৪ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা সরকারের লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রীনেপালে দুই হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে ভারতীয় নাগরিক নিহত

কয়রায় কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ

কয়রা (খুলনা) প্রতিনিধি

প্রকাশ : ৩ নভেম্বর ২০২৬, ৫:৫৩ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
কয়রায় কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ
কয়রায় কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ

খুলনার কয়রায় প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন সড়কে ভালো ইটের আড়ালে নিম্নমানের ‘আমা ইট’ মজুত রেখে ব্যবহারের প্রস্তুতি এবং প্রাক্কলন অনুযায়ী বালু না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন সড়কটির নির্মাণস্থলে স্তূপ করে রাখা ইটের বাইরের দিকে তুলনামূলক ভালো ইট থাকলেও ভেতর থেকে বের করা একাধিক ইট সামান্য আঘাতেই ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যেতে দেখা গেছে। ইতিমধ্যে সড়কের ৩ কিলোমিটার অংশে বালু ও ইটের খোয়া বিছানোর কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ২ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার অংশে বালু বিছানো শেষ হলেও খোয়া দেওয়ার কাজ চলছে। এ অবস্থায় সরকারি অর্থে নির্মাণাধীন সড়কের গুণগত মান, স্থায়িত্ব এবং এলজিইডির তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দারা। 

নির্ধারিত সময়ের দুই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ হয়নি। এর মধ্যেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও বালু কম দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

এলজিইডির কার্যাদেশ অনুযায়ী, খুলনা বিভাগ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কয়রার জাগীর মহল বাজার–গিলাবাড়ী সড়কের মোট ৫ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার উন্নয়নকাজ দুটি পৃথক প্যাকেজে বাস্তবায়ন করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। প্যাকেজ দুটির সম্মিলিত চুক্তিমূল্য প্রায় ৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯ হাজার টাকা। 

প্রথম প্যাকেজে সড়কের ৩ কিলোমিটার উন্নয়নকাজের চুক্তিমূল্য ৩ কোটি ৩০ লাখ ৬৭ হাজার ৯৯০ টাকা। 

দ্বিতীয় প্যাকেজে একই সড়কের আরও ২ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার উন্নয়নকাজের চুক্তিমূল্য প্রায় ৩ কোটি ১৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা। 

উভয় প্যাকেজের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল একই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে দুই বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। কাজের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে কি না এবং বিল পরিশোধের অগ্রগতি কতটুকু, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

সোমবার (২ নভেম্বর) সরেজমিনে নির্মাণস্থলে গিয়ে দেখা যায়, প্রথম প্যাকেজের ৩ কিলোমিটার অংশে বালু ও ইটের খোয়া বিছানো হয়েছে। দ্বিতীয় প্যাকেজের ২ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার অংশে বালু বিছানোর কাজ শেষ হলেও কিছু অংশে খোয়া দেওয়া হয়েছে। অবশিষ্ট অংশে খোয়া তৈরির জন্য সড়কের পাশে বিপুল পরিমাণ ইট মজুত রাখা হয়েছে। এসব ইটের স্তূপের বাইরের দিকে তুলনামূলক ভালো মানের ইট থাকলেও ভেতরে নিম্নমানের বলে প্রতীয়মান হওয়া ইট পাওয়া যায়। 

এ সময় মহেশ্বরীপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মহাষীশ সরদার প্রতিবেদকের সামনে ইটের স্তূপের ভেতর থেকে কয়েকটি ইট বের করেন। সামান্য আঘাত করতেই সেগুলো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায়। 

ইউপি সদস্য মহাষীশ সরদার বলেন, তুলনামূলক ভালো ইটের আড়ালে আমা ইট রাখা হয়েছে। সামান্য আঘাতেই এসব ইট গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে। এমন ইট দিয়ে সড়ক নির্মাণ করলে তা টিকবে না। সরকারি টাকায় এমন কাজ মেনে নেওয়া যায় না।’ 

স্থানীয় বাসিন্দা বিশ্বজিৎ মণ্ডল, পল্লব রায়, অচিন্ত কুমার ও বিজন সরদারও ইটের স্তূপ থেকে একাধিক ইট বের করে দেখান। তাঁদের দেখানো ইটগুলোও সামান্য আঘাতে ভেঙে গুঁড়ো হতে দেখা যায়। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সড়কের পাশে নিম্নমানের ইট মজুত রেখে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সড়কের ভিত্তি তৈরিতে অনুমোদিত প্রাক্কলন অনুযায়ী নির্ধারিত পুরুত্বে বালু দেওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে যেসব অংশে বালু ও খোয়া বিছানো হয়েছে, সেসব অংশের নির্মাণসামগ্রীর মান ও পরিমাণ নিয়েও তাঁদের আপত্তি রয়েছে। 

তাঁদের দাবি, নির্মাণস্থলে মজুত ইটের মান যাচাই না করে খোয়া তৈরিতে ব্যবহার করা হলে সড়কের স্থায়িত্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে। একইভাবে প্রাক্কলনের তুলনায় কম বালু ব্যবহার করা হলে সড়কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ইতিমধ্যে সম্পন্ন কাজের মান নিয়ে। প্রথম প্যাকেজের ৩ কিলোমিটার অংশে বালু ও খোয়া বিছানো শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় প্যাকেজের ২ দশমিক ৭৮ কিলোমিটার অংশেও বালু বিছানো হয়েছে। এসব অংশে প্রকৃতপক্ষে কতটুকু বালু ও খোয়া ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা অনুমোদিত প্রাক্কলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। 

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্মাণস্থলে মজুত ইটের গুণগত মান পরীক্ষার প্রতিবেদন, বালুর স্তরের নির্ধারিত পুরুত্ব এবং সম্পন্ন কাজের মেজারমেন্ট বুক (এমবি) যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নিম্নমানের বলে অভিযোগ ওঠা ইটের নমুনা পরীক্ষার আগে সেগুলো নির্মাণকাজে ব্যবহার বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

এদিকে নির্মাণকাজের মান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অভিযোগ উঠেছে। একটি ফেসবুক পোস্টে নিম্নমানের ইট ব্যবহার ও বালু কম দেওয়ার পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ তোলা হয়েছে। 

স্থানীয়দের প্রশ্ন, সড়কের পাশে বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের বলে অভিযোগ ওঠা ইট মজুত থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীরা কী ব্যবস্থা নিয়েছেন? ইটের মান পরীক্ষা করা হয়েছে কি না এবং ইতিমধ্যে বিছানো বালু ও খোয়ার পরিমাণ প্রাক্কলনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে কি না, তারও ব্যাখ্যা চান তাঁরা। 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কয়রা উপজেলা এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী আজফাল হোসেন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘আপনার বয়সের চেয়েও বেশি দিন চাকরি করি। আমাকে ইট চেনাতে হবে না। যা ইচ্ছা রিপোর্ট করেন।’ তবে নিম্নমানের ইট মজুত এবং প্রাক্কলন অনুযায়ী বালু না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি। 

অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ইউনুস এন্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধির কাছে নিম্নমানের ইট মজুত ও বালু কম দেওয়ার অভিযোগ তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, ‘যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সমাধান করে দেব।’ 

তবে এলজিইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে নিম্নমানের নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। মজুত ইট অপসারণ, নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা কিংবা ইতিমধ্যে সম্পন্ন কাজের ত্রুটি সংশোধনে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি। 

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বাসিন্দাদের দাবি, নির্মাণস্থলে মজুত নিম্নমানের ইট অপসারণ করে মানসম্মত ইট সরবরাহ, সম্পন্ন কাজের বালু ও খোয়ার পুরুত্ব যাচাই এবং স্বাধীন কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে সড়কের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের দুই বছরের বেশি সময় পরও কাজ শেষ না হওয়ার কারণ এবং প্রকল্পের বিল পরিশোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে হবে। 

অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এ বিষয়ে কয়রার সংসদ সদস্য ও খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসকের হস্তক্ষেপও কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার এই সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত প্রাক্কলন অনুযায়ী মানসম্মত কাজ নিশ্চিত হবে, নাকি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর অভিযোগের নিষ্পত্তি ছাড়াই কাজ এগিয়ে যাবে সেদিকেই এখন নজর স্থানীয়দের।

ভোরের আকাশ/রই

শেয়ার করুন: