সারিয়াকান্দিতে এলজিইডির এলসিএস প্রকল্পে ‘নাম বদলের খেলা’

বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের লেবার কন্ট্রাকটিং সোসাইটি (এলসিএস) কর্মসূচিতে এক নজিরবিহীন জালিয়াতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
সরকারি নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একই ব্যক্তি নাম, পরিচয় ও নিকটাত্মীয়দের ট্যাগ ব্যবহার করে বছরের পর বছর এই প্রকল্পের কাজ হাতিয়ে নিচ্ছেন। ফলে রাষ্ট্রের দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচি মার খাচ্ছে, আর বঞ্চিত হচ্ছেন সমাজের সত্যিকারের অসহায় ও দুস্থ নারীরা।
এলসিএস নীতিমালা অনুযায়ী, একজন দুস্থ নারী তাঁর জীবনে মাত্র একবার এবং সর্বোচ্চ তিন বছর মেয়াদে এই প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ পাবেন। কিন্তু সারিয়াকান্দির মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে জানা যায় ভিন্ন চিত্র। এখানে গড়ে উঠেছে একটি সুসংগঠিত চক্র, যারা জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি ও পারিবারিক সম্পর্কের আড়ালে এই নিয়মকে পুরোপুরি ভেঙে ফেলেছে।
সদর ইউনিয়নের দিঘলকান্দি গ্রামের পারভীন বেগম নিজের নামে একটানা ৩ বছর কাজ শেষ করেছেন। কিন্তু থেমে থাকেননি তিনি; এবার নিজের মেয়ের নামের কোটায় তালিকাভুক্ত হয়ে মাঠের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি নিজেই।
পৌরসভার হিন্দুকান্দি গ্রামের ৫০ বছর বয়সী বিলকিস বেগম বিগত ৬ বছর ধরে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও এবার তিনি নিজের পরিচয় আড়ালে রেখে ছেলের বউ মিষ্টি বেগমের নামে কাজটি বাগিয়ে নিয়েছেন।
ফুলবাড়ি ইউনিয়নের খুকি বেগম হাটশেরপুরে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সুবাদে নিজের ৩ বছরের মেয়াদ শেষে এখন মেয়ে মাহমুদা বেগমের নামে কাজ করছেন। একই কায়দায় নারচী ইউনিয়নের শাহিনুর বেগম ৩ বছর কাজ করার পর সদর ইউনিয়নের তিতপরল গ্রামের আপন বোন আরজিনা বেগমের নামে কাজ করছেন বলে স্বীকার করেছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই ধারাবাহিক জালিয়াতির মূল চালিকাশক্তি হলো প্রকল্পের মেয়াদ শেষে পাওয়া মোটা অঙ্কের এককালীন সঞ্চয়। এলসিএস প্রকল্পের ৩ বছরের মেয়াদ শেষে প্রত্যেক শ্রমিকের অনুকূলে ১ লাখ ১১ হাজার থেকে ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত এককালীন সঞ্চয় পরিশোধের বিধান রয়েছে।
পুরনো ও অভিজ্ঞ এই চক্রটি বারবার এই লোভনীয় অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। তবে ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ১ লাখ ১৫ হাজার টাকার স্থলে ১ লাখ ৮ হাজার বা ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা ধরিয়ে দেওয়া হয়। বাকি টাকার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব বা হদিস দিতে পারেন না সংশ্লিষ্ট মাঠকর্মচারীরা।
প্রকল্পের নীতিমালা অনুযায়ী, এলসিএস দল গঠনের সময় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, সদস্য এবং এলজিইডির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে শতভাগ যাচাই-বাছাই করার কড়া বিধান রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও স্থানীয় দালালের যোগসাজশে এই নিয়ম নামমাত্র কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বঞ্চিত নারী অভিযোগ করে বলেন, "যারা গত ৩ বছর ধরে কাজ করেছে, তারাই এখন মেয়ে, ছেলের বউ কিংবা আত্মীয়দের নামে নতুন তালিকায় ঢুকে পড়েছে। আমরা অফিসে ঘুরেও কাজ পাচ্ছি না, কারণ আমাদের দেওয়ার মতো দালালের উৎকোচের টাকা নেই।"
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষায় নেওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি আজ কতিপয় দুর্নীতিবাজের সিন্ডিকেটের কারণে পথ হারাচ্ছে। এলাকার প্রকৃত বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা ও চরম দরিদ্র নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এবিষয়ে উপজেলা এলজিইডি'র কমিউনিটি অর্গানাইজার দীপন চন্দ্র সূত্রধর উর্ধতন কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
অভিযোগের বিষয়ে সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রকৌশলী তুহিন সরকার মুঠোফোনে বলেন, প্রতি তিন বছর পর নতুন করে নারী শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। তিন বছর শেষে একজন শ্রমিক পুনরায় কাজ করতে পারবেন। তবে একজনের এনআইডি দিয়ে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর তাঁর পরিবর্তে অন্য কেউ কাজ করতে পারবেন না; প্রক্সি হিসেবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
এলজিইডির এই বক্তব্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে পাওয়া অভিযোগের কিছু প্রশ্নের তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আগের শ্রমিকের পরিবর্তে মেয়ে, ছেলের বউ বা আত্মীয়ের নামে নতুন করে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর বাস্তবে কে কাজ করছেন, সেটি যাচাই করা প্রয়োজন।
ভোরের আকাশ/ এনউব