শেরপুর উত্তরা হাসপাতালের এমডি উধাও, কর্মচারীর বেতন-ভাতা অনিশ্চিত

শেরপুর জেলা শহরের গৌরীপুর মহল্লায় অবস্থিত উত্তরা স্পেশালাইজড প্রাইভেট লিমিটেড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) যোবায়ের রহমান বিপ্লবের বিরুদ্ধে প্রায় ১০ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের শতাধিক কর্মচারী, অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাওনাদাররা এ অভিযোগ করেছেন। তবে বিপ্লবের দাবি, হাসপাতালটি অন্যরা দখল করে নিয়েছে এবং জীবনের নিরাপত্তার শঙ্কায় তিনি সেখানে যাচ্ছেন না।
এদিকে এমডি হঠাৎ অনুপস্থিত হয়ে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন হাসপাতালের কর্মচারী ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি থাকা প্রায় ৩০ জন রোগীর চিকিৎসাসেবা চালু রাখতে এবং কর্মচারীদের কাজ অব্যাহত রাখতে সংশ্লিষ্টরা জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালের কার্যক্রম চালু রেখেছেন।
বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন, শেরপুর চেম্বার অব কমার্স, জেলা হাসপাতাল মালিক সমিতি, জেলা আইনজীবী সমিতি ও প্রেসক্লাবের নেতৃবৃন্দকে অবহিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে যোবায়ের রহমান বিপ্লব, কয়েকজন চিকিৎসক, ৮-১০ জন বিনিয়োগকারী ও কয়েকজন অংশীদারের উদ্যোগে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের সঙ্গে এটি শেরপুর শহরের একটি পরিচিত চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে ২০২৫ সালে হাসপাতালটি কাউকে না জানিয়ে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়েছে এমন অভিযোগ করেন অংশীদার ও বিনিয়োগকারীরা।
তাদের অভিযোগ, এরপর থেকেই কর্মচারীদের বেতন, অংশীদারদের লভ্যাংশ, বিনিয়োগকারীদের পাওনা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধে অনিয়ম শুরু হয়। এ নিয়ে হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিপ্লবের বিরোধ তৈরি হয়।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে কর্মচারী, অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও অন্যান্য পাওনাদাররা কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে বিপ্লবের কার্যালয়ে বৈঠক করেন। সেখানে পাওনা পরিশোধের জন্য তাকে অনুরোধ করা হয়। এ সময় হিসাব-নিকাশের জন্য বিপ্লব তিন দিন সময় নেন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ওই বৈঠকে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, জেলা বেসরকারি হাসপাতাল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন ক্রিসেন্ট, ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কায়সার আহাম্মেদ ফারুক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন কবির মুরাদ, প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ হাসান বাদলসহ স্থানীয় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন।
তবে তিন দিন সময় নেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের এক দিন আগেই বিপ্লব হাসপাতাল থেকে চলে যান বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এরপর থেকে তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে দাবি তাদের।
সংশ্লিষ্ট সমিতির নেতারা একাধিকবার বিপ্লবকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানালেও তিনি হাসপাতাল বিক্রি করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সমাধান হয়নি।
এদিকে শতাধিক কর্মচারীর বেতন পরিশোধ না হওয়ায় হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে গত ৩০ সেপ্টেম্বর কর্মচারী, সমিতির নেতৃবৃন্দ ও হাসপাতালে কর্মরত কয়েকজন চিকিৎসক বৈঠক করেন। সেখানে বিপ্লব ফিরে না আসা পর্যন্ত হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আপৎকালীন সময়ে একটি জবাবদিহিমূলক কমিটির মাধ্যমে শুধু কর্মচারীদের বেতন ও হাসপাতালের জরুরি খরচ পরিচালনা করা হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো অংশীদার বা বিনিয়োগকারীকে অর্থ পরিশোধ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অন্তত ১৫টি চুক্তিনামা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব চুক্তিতে বিভিন্ন পাওনাদারের কাছে বিপ্লবের মোট পাওনা প্রায় ১১ কোটি টাকা বলে উল্লেখ রয়েছে। চুক্তিনামাগুলোতে বিপ্লবের স্বাক্ষর রয়েছে বলেও সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, সব খরচ বাদ দেওয়ার পর হাসপাতাল থেকে মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা আয় হতো। তবে বেশ কিছুদিন ধরে ওই অর্থ থেকে অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। তাদের অভিযোগ, বিপ্লব হাসপাতালের অর্থ দিয়ে একাধিক ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।
এছাড়া নতুন একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার জন্য ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগের শর্তে তিনি প্রায় ৩ কোটি টাকা অগ্রিম দিয়েছেন বলেও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। ওই প্রকল্পে অংশীদার করার কথা বলে হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারীর কাছ থেকেও প্রায় এক কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। তাদের দাবি, অনেক কর্মচারী নিজেদের সম্পদ বিক্রি করে ওই অর্থ দিয়েছিলেন।
ফলে বর্তমানে কর্মচারী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, বিপ্লব হাসপাতালে ফিরে এসে সবার সঙ্গে বসে হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার করলেই সংকটের সমাধান হতে পারে।
গত ৫ অক্টোবর রাতে হাসপাতালের বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা বলেন, বিপ্লব পালিয়ে না থেকে সবার সঙ্গে আলোচনায় বসলেই বিষয়টির সমাধান সম্ভব। হাসপাতালটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবাই মিলে চালু রেখেছেন। এটি দখল করার কোনো প্রশ্নই আসে না বলেও তারা দাবি করেন।
সরেজমিনে হাসপাতাল এলাকায় গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাসপাতালের কার্যক্রম চালু রয়েছে। বিপ্লবের কক্ষ ও চেয়ারও আগের মতোই রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তবে অর্থসংকটের কারণে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে।
সংকটকালীন হাসপাতাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ডা. মবিনা ফেরদৌস বলেন, উনার কাছে অসংখ্য মানুষ টাকা পান। এভাবে নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি। কর্মচারী, রোগী ও জনস্বার্থে হাসপাতালটি খোলা রাখা হয়েছে। তিনি ফিরে এলেই আলোচনার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
শেরপুর চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আরিফ হোসেন বলেন, বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। হাসপাতাল দখল হয়নি, বরং চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।
শেরপুর জেলা হাসপাতাল মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কায়সার আহাম্মেদ ফারুক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহসিন কবির মুরাদ বলেন, অনেক মানুষ বিপ্লবের কাছে কোটি কোটি টাকা পান। তিনি পলাতক থেকে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। সংগঠনের একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে তার এমন আচরণ দুঃখজনক।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিপ্লবের কাছে অনেকেই টাকা পান। অযথা হাসপাতাল দখলের কথা বলে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাকে সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে তিনি চলে গেছেন।
শেরপুরের পুলিশ সুপার এ কে এম জহিরুল ইসলাম বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, হাসপাতাল দখল হয়নি। বিপ্লব অনেক মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বর্তমানে সেখানে নেই। গুরুত্বপূর্ণ এই চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্টরা চালু রেখেছেন। তবে তিনি দখলের বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিলে পুলিশ তা আইন অনুযায়ী আমলে নেবে।
জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, আমরা আবেদন পেয়েছি। হাসপাতাল দখলের ঘটনা ঘটেনি। একজন ফেসবুকে দখলের অভিযোগ করছেন, তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেননি।
অন্যদিকে উত্তরা হাসপাতালের এমডি যোবায়ের রহমান বিপ্লব দাবি করেছেন, হাসপাতালটি দখল করে নেওয়া হয়েছে। তার অভিযোগ, জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকায় তিনি হাসপাতালে যাচ্ছেন না। তবে তার কাছে পাওনাদারদের পাওনা অর্থের বিষয়ে জানতে চাইলে এ বিষয়ে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। বরং হাসপাতালের মালিকানা ছেড়ে দেওয়ার শর্তে তিনি অভিযুক্তদের কাছে অর্থ দাবি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতালটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকলেও কর্মচারী, রোগী, বিনিয়োগকারী ও পাওনাদারদের স্বার্থে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের দাবি উঠেছে।
ভোরের আকাশ/ এনউব