১৮ বছরে বাড়েনি আদালত বেড়েছে মামলার পাহাড়

চট্টগ্রাম মহানগরীতে জনসংখ্যার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মামলার সংখ্যা। কিন্তু গত ১৮ বছরেও বাড়েনি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সংখ্যা। মাত্র আটটি আদালতের ওপর নির্ভর করে চলছে মহানগরের বিশাল বিচার কার্যক্রম। ফলে প্রতিনিয়ত জমছে মামলার স্তূপ। বর্তমানে এসব আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৭১টিতে।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন মামলা ছিল ৫৯ হাজার ৯৪৯টি। পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৬ হাজার ২৪৯টিতে। আর চলতি সময়ে সেই সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৬৯ হাজার। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বিচারাধীন মামলা বেড়েছে প্রায় ১০ হাজার।
মামলার এই ক্রমবর্ধমান চাপের বিপরীতে নতুন আদালত না বাড়ায় বিচারপ্রার্থীদের অপেক্ষার সময় যেমন বাড়ছে, তেমনি আইনজীবীদেরও প্রতিদিন নানা ভোগান্তির মধ্য দিয়ে আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মামলা নিষ্পত্তির তুলনায় নতুন মামলা দায়েরের হার বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হচ্ছে।
থানার ১৬টি, আদালত মাত্র ৮
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের আওতাধীন থানার সংখ্যা ১৬টি। অথচ এর বিপরীতে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত রয়েছে মাত্র আটটি। আদালত সংশ্লিষ্টদের মতে, মহানগরের থানার সংখ্যা ও মামলার চাপ বিবেচনায় অন্তত ১৬টি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রয়োজন। আদালতের সংখ্যা বাড়ানো গেলে মামলার নিষ্পত্তির হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
আদালত সূত্র জানায়, গত জুন মাসে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নতুন মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৭২৮টি। জুলাইয়ে দায়ের হয়েছে আরও ৫ হাজার ৪৫০টি মামলা। বিপুলসংখ্যক নতুন মামলার বিপরীতে বিদ্যমান আদালতগুলোতে বিচারক ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে মামলার জট।
১৮ বছরেও বাড়েনি আদালত
বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর সাতটি আদালত নিয়ে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসির কার্যক্রম শুরু হয়। পরের বছর একটি আদালত বাড়িয়ে সংখ্যা করা হয় আটটি। এরপর কেটে গেছে প্রায় দেড় যুগ। মহানগরের জনসংখ্যা ও মামলা বহুগুণ বাড়লেও আদালতের সংখ্যা আর বাড়েনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর দাবিতে ২০১৩ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো নতুন আদালত প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
সর্বশেষ গত ৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসিতে তিনটি অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং ২০টি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে আদালত প্রশাসন।
বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি চরমে
চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা বলছেন, মহানগরের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় আটটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। আদালতের স্বল্পতার কারণে মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। একটি মামলার পরবর্তী তারিখ পেতেও অনেক সময় দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে বিচারপ্রার্থীদের।
আইনজীবী সমিতির সভাপতি তারিক আহমদ বলেন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বর্তমানে প্রায় ৭০ হাজার মামলা বিচারাধীন। আদালতের সংখ্যা কম থাকায় আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী উভয়কেই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও চিঠিপত্র দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, মামলার চাপ যেভাবে বাড়ছে, তাতে নতুন আদালত প্রতিষ্ঠা ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ সময় আদালতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে, যা বিচারপ্রাপ্তির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে।
আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মঈনুদ্দীন বলেন, আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের স্বাভাবিকভাবে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। ভিড় ও স্থান সংকটের কারণে প্রতিদিনই নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বৃষ্টি ও গরমের সময় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব, অগ্রগতি নেই
চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. গিয়াস উদ্দীন চৌধুরী বলেন, প্রতিদিনই নতুন মামলা যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে আদালতের সংখ্যা অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে বিদ্যমান আদালতগুলোর ওপর মামলার চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
তিনি জানান, গত ৩ জানুয়ারি তিনটি অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং ২০টি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রস্তাবটির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি বা নতুন তথ্য পাওয়া যায়নি।
আদালত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত নতুন আদালত প্রতিষ্ঠা করা না গেলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেসিতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সামনে আরও বাড়বে। এতে মামলার জট যেমন দীর্ঘস্থায়ী হবে, তেমনি ন্যায়বিচার পেতে সাধারণ মানুষের অপেক্ষার সময়ও আরও দীর্ঘ হতে পারে।
ভোরের আকাশ/ এনউব