কুড়িগ্রামে তিন মাস ধরে বন্ধ হরিজন শিশুদের পাঠকেন্দ্র

কুড়িগ্রামে প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি পাঠকেন্দ্র। এতে ৩৬ শিশুর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে গেছে। দরিদ্র পরিবারের এসব শিশু অর্থের অভাবে অন্য কোথাও পড়তে না পারায় তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সরেজমিনে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম হরিজন পল্লীতে প্রায় ৪০০ পরিবারের বসবাস। এলাকায় সরকারি কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই। শিশুদের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করতে ব্যক্তি উদ্যোগে ‘নিরন্তর ভালোবাসা’ নামে পাঠদান কেন্দ্রটি পরিচালিত হয়ে আসছিল। কেয়ার বাংলাদেশের সৌহার্দ্য-২ প্রকল্পের সময় নির্মিত কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টারের একটি কক্ষে পাঠকেন্দ্রটির কার্যক্রম চলত।
পাঠকেন্দ্রটির পরিচালক শুভ্রজ্যোতি সেন শর্মা বলেন, ২০২৪ সাল থেকে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে হরিজন শিশুদের সেখানে পড়িয়ে আসছেন এবং শিক্ষকের বেতনও নিজেই বহন করেন। তাঁর দাবি, চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে কেন্দ্রটির জন্য অতীতের ২৬ মাসের ২৬ হাজার টাকা এবং পরবর্তী সময়ে মাসে এক হাজার টাকা করে দেওয়ার দাবি করা হয়। এ নিয়ে বিরোধের পর পাঠকেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়।
পাঠকেন্দ্রের এক শিশু শিক্ষার্থী রাম রায় বলেন, ‘স্যার, আমাদের স্কুল কবে খুলবে? আমাদের স্কুলটা তাড়াতাড়ি খুলে দেন।’
অভিভাবক জোসনা রানী বলেন, ‘আমরা অনেক গরিব মানুষ। টাকার অভাবে সন্তানদের বাইরে পড়াতে পারি না। এখানে বিনা পয়সায় পড়তে পারত। তিন মাস ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় সন্তানদের পড়ালেখার ক্ষতি হচ্ছে।’
হরিজন সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পাদক মতিলাল বাশফোর বলেন, ‘এখানে পড়া অধিকাংশ শিশুই দরিদ্র পরিবারের। তাদের বাইরে গিয়ে পড়ার সামর্থ্য নেই। দ্রুত সমস্যার সমাধান করে পাঠকেন্দ্রটি খুলে দেওয়া প্রয়োজন।’
তবে পাঠকেন্দ্র বন্ধের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় কমিটির সভাপতি মজনু মিয়া। তিনি বলেন, কেয়ার প্রকল্পের পর স্থানীয়দের নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে ঘরটি পরিচালিত হচ্ছে। শুভ্রজ্যোতি সেন শর্মার কাছে তিনি কোনো চাঁদা বা ভাড়া দাবি করেননি। তাঁর দাবি, ২৯ মাসের মধ্যে প্রথম তিন মাসের তিন হাজার টাকা দেওয়া হলেও পরবর্তী ২৬ মাসের কোনো টাকা দেওয়া হয়নি। এ কারণে ২৬ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। টাকা চাওয়ার পর পাঠকেন্দ্রে তালা দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।
কেয়ার বাংলাদেশের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর কমিউনিটি রিসোর্স সেন্টারের ঘর স্থানীয়দের সামাজিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিনামূল্যে ব্যবহারের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেনের সুযোগ থাকার কথা নয়।
কুড়িগ্রাম পৌরসভা ও গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ওই জায়গা সরকারি সম্পত্তি এবং কাউকে লিজ দেওয়া হয়নি। শিক্ষা কার্যক্রমে বাধা দেওয়া অনুচিত বলেও তারা জানিয়েছে।
হরিজন সম্প্রদায়ের সভাপতি নন্দলাল বাশফোর বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের পড়ালেখার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত পাঠকেন্দ্রটি খুলে না দিলে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।’
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও জাতীয় জনজাতি জোটের আহ্বায়ক ভিমপাল্লী ডেভিড রাজু বলেন, হরিজন সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পাঠকেন্দ্র বন্ধের বিষয়টি দুঃখজনক। এর পেছনে দায়ী যে-ই হোক, বিষয়টি সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ভোরের আকাশ/ এনউব