গাজীপুরে ২১৯৩ স্কুলের অনুমোদন ও বৃত্তি পরীক্ষায় সুযোগের দাবি

গাজীপুরের অনিবন্ধিত ও পাঠদানের অনুমতিবিহীন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অনুমোদন ও নিবন্ধন কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার দাবি জানিয়েছে গাজীপুর কেজি স্কুল এসোসিয়েশন। একই সঙ্গে এসব বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির যোগ্য শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৬-এ অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়ার কাছে এ দাবিতে স্মারকলিপি দেন সংগঠনের নেতারা। একই দাবিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরেও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, গাজীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় বিপুলসংখ্যক বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল অসংখ্য পরিবার সন্তানদের শিক্ষাজীবন পরিচালনা করছে।
সংগঠনটির দাবি, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (কিন্ডারগার্টেনসহ) নিবন্ধন বিধিমালা-২০২৩ ও পরবর্তী সংশোধনী অনুযায়ী পাঠদানের অনুমতি ও নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ায় গাজীপুরের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, গাজীপুরের পাঁচটি উপজেলায় ২ হাজার ১৯৩টি অনিবন্ধিত বা পাঠদানের অনুমতিবিহীন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৫০ লাখ ৪৫ হাজার ৭৮ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত বলে দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী রয়েছে ৬৫ হাজার ৯৪৫ জন।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৮ মার্চ ২০২৬ তারিখের পরিপত্র অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণির ৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৬-এ অংশগ্রহণের সুযোগ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে সংগঠনটি। তাদের দাবি, বিদ্যালয়ের অনুমোদন ও নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে গাজীপুরের ২ হাজার ৬৩৭ জন যোগ্য শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।
‘বিদ্যালয়ের জটিলতার দায় শিক্ষার্থীদের ওপর কেন?’
স্মারকলিপিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, কোনো বিদ্যালয়ের নিবন্ধন বা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক, কারিগরি কিংবা আইনগত জটিলতা থাকলে তার দায় শিক্ষার্থীদের ওপর বর্তাবে কেন?
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, একজন পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা আদালতের কোনো রিট বা দাপ্তরিক জটিলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। সে নিয়মিত পড়াশোনা করে নির্ধারিত শ্রেণিতে উঠে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। বিদ্যালয়ের অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তার মেধা যাচাইয়ের জাতীয় সুযোগ বন্ধ হলে শিক্ষাজীবনে বৈষম্য তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ও নির্ধারিত শিক্ষাক্রম অনুসরণ করে পঞ্চম শ্রেণিতে পৌঁছানো শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হলে এর প্রভাব শিক্ষার্থী ছাড়াও তাদের অভিভাবক ও পরিবারের ওপর পড়বে বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার দাবি
স্মারকলিপিতে বলা হয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের ভবন, অগ্নিনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি, স্যানিটেশন, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ কিংবা নিরাপদ পরিবেশসংক্রান্ত শর্ত পূরণে ঘাটতি থাকলে পরিদর্শন ও যাচাইয়ের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করা যেতে পারে। এরপর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঘাটতি পূরণের জন্য লিখিত নির্দেশনা ও যৌক্তিক সময় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
যেসব প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত শর্ত পূরণ করেছে, সেগুলোর অনুমোদন ও নিবন্ধন দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠানে ঘাটতি রয়েছে, সেগুলোর ঘাটতি পূরণের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
বৃত্তি পরীক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থার দাবি
গাজীপুরের অনিবন্ধিত বা অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন বিদ্যালয়গুলোর পঞ্চম শ্রেণির যোগ্য শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন (ডিআর) আবেদন গ্রহণ ও অনুমোদনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া বিদ্যালয়ের অনুমোদন বা নিবন্ধনসংক্রান্ত প্রশাসনিক কিংবা আইনগত জটিলতার কারণে কোনো যোগ্য শিক্ষার্থী যেন প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৬ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে জরুরি বিশেষ নির্দেশনা জারির দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাতে সরকারি বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তকসহ প্রাপ্য শিক্ষাসুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
১০ দফা দাবি
স্মারকলিপিতে গাজীপুর কেজি স্কুল এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে। দাবিগুলো হলো—
১. অনিবন্ধিত ও অনুমোদনবিহীন বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের অনুমতি ও নিবন্ধন কার্যক্রম জরুরি ভিত্তিতে চালু করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা।
২. ইতোমধ্যে আবেদন করা বিদ্যালয়গুলোর আবেদন দ্রুত যাচাই-বাছাই করে শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন ও নিবন্ধন দেওয়া।
৩. ভবন, স্বাস্থ্যবিধি, স্যানিটেশন, অগ্নিনিরাপত্তা বা অন্যান্য কারিগরি শর্তে ঘাটতি থাকলে তা পূরণের জন্য লিখিত নির্দেশনা ও যৌক্তিক সময় দেওয়া।
৪. বৃত্তি পরীক্ষা-২০২৬-এর সময়সীমা বিবেচনায় গাজীপুরের প্রক্রিয়াধীন বিদ্যালয়গুলোর পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিশেষ বিবেচনায় ডিআর আবেদন গ্রহণ ও অনুমোদনের ব্যবস্থা করা।
৫. অনুমোদন বা নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে যোগ্য শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পরীক্ষা থেকে বঞ্চিত না করার জন্য জরুরি নির্দেশনা জারি করা।
৬. যোগ্য শিক্ষার্থীদের ডিআর সম্পন্ন করে বৃত্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা।
৭. এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সরকারি বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তকসহ প্রাপ্য শিক্ষাসুবিধা নিশ্চিত করা।
৮. দ্রুত সমাধানের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও সংশ্লিষ্ট কারিগরি ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি বা টাস্কফোর্স গঠন করা।
৯. উচ্চ আদালতে কোনো মামলা বা রিটের কারণে আইনগত সীমাবদ্ধতা থাকলে আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শিক্ষার্থীবান্ধব অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
১০. বিদ্যালয়ের অনুমোদন ও নিবন্ধনের প্রশাসনিক জটিলতার দায় কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া।
স্মারকলিপির শেষাংশে বলা হয়, বিদ্যালয়ের অনুমোদন নিয়ে প্রশাসনিক বা আইনগত যে জটিলতাই থাকুক না কেন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন এর কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়। যোগ্য শিক্ষার্থীদের জাতীয় মেধা যাচাইয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হলে তাদের শিক্ষাজীবনে অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
এ কারণে গাজীপুরের বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অনুমোদন ও নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসন, যোগ্য বিদ্যালয়গুলোর অনুমোদন এবং ২০২৬ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় যোগ্য শিক্ষার্থীদের ডিআর আবেদন অনুমোদন করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, ‘বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক জটিলতার শাস্তি যেন কোনো শিশুকে বহন করতে না হয়।’ গাজীপুর কেজি স্কুল এসোসিয়েশনের সভাপতি আজিজুল ইসলাম মানু ও সাধারণ সম্পাদক মো. রওনাক হোসেন স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর করেন।
ভোরের আকাশ/সু.পা