বিজয়ার আনন্দ বিষাদে পুড়ে ছাই
দশমীর রাতে খুলনায় বসতবাড়ি পুড়ে ছাই, ৯ পরিবার নিঃস

খুলনার ডুমুরিয়ায় বিজয়া দশমীর রাতে চারদিকে উৎসবের আমেজ, প্রতিমা বিসর্জন আর সিঁদুর খেলার আনন্দে মেতে উঠেছিলেন সবাই। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেই হঠাৎ নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়।
মুহূর্তের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় দুই ভাইয়ের সাজানো সংসার। চোখের সামনে আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হয় ঘরের আসবাবপত্র, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা, কাপড়চোপড়, শিক্ষার্থীদের বই-খাতাসহ জীবনের প্রয়োজনীয় সবকিছু। পরনের কাপড় ছাড়া অবশিষ্ট বলতে কিছুই নেই। উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নেয় কান্না আর আহাজারিতে।
বিজয়া দশমীর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস মধ্যপাড়া এলাকায় বিষ্ণুপদ দেবনাথের বাড়িতে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুনে তার দুই ছেলে বঙ্কিম দেবনাথ ও তপন দেবনাথের বসতঘর এবং সংযুক্ত রান্নাঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। এতে প্রায় ২০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিষ্ণুপদ দেবনাথের দুই ছেলে বঙ্কিম ও তপন একই বাড়ির পৃথক দুটি কক্ষে পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। দুই পরিবারের সদস্যসংখ্যা নয়জন। বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় তারা বাড়ির পাশের সাহস মধ্যপাড়া দুর্গামণ্ডপে সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জনের আনন্দে ব্যস্ত ছিলেন। এ সময় বাড়ির বারান্দায় একটি এলইডি বাল্ব জ্বলছিল। এরই মধ্যে বসতঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের ভয়াবহতা বাড়তে থাকায় আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তবে গ্রামের সরু রাস্তার কারণে আগুন নেভানোর কাজে বেগ পেতে হয়। প্রায় সোয়া ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে ঘরের কোনো আসবাবপত্রই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। আগুনের তাপে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ফুট উঁচু তিনটি গাছের ডালপালাও সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।
আগুনে নিঃস্ব হওয়া পরিবার দুটির দুর্দশা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে সন্তানদের পড়াশোনার অনিশ্চয়তায়। বঙ্কিম দেবনাথের বড় মেয়ে অনার্সে এবং ছেলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। অন্যদিকে তপন দেবনাথের মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী। আগুনে তাদের বই-খাতাও পুড়ে গেছে। বসতঘরের সঙ্গে পুড়ে গেছে পরিবারের দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী।
বঙ্কিম দেবনাথ ডুমুরিয়া বাজারে রুটির দোকান পরিচালনা করেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সুন্দরবনের দুবলার চরে পোশাকের ব্যবসা করে আসছেন। আগামী সোমবার তার দুবলার চরে যাওয়ার কথা ছিল। এ জন্য বাড়িতে নতুন ধরনের পোশাকের পর্যাপ্ত মজুতও করেছিলেন। কিন্তু আগুনে সবকিছু হারিয়ে এখন দিশেহারা তিনি।
বঙ্কিম বলেন, আমি ডুমুরিয়া বাজারে রুটির দোকান করি। দীর্ঘদিন ধরে দুবলার চরে পোশাকের ব্যবসাও করছি। আগামী সোমবার সেখানে যাওয়ার কথা ছিল। ব্যবসার জন্য ঘরে নতুন আইটেমের অনেক পোশাক রাখা ছিল। সোনার গয়না, খাট-পালঙ্ক, সেলাই মেশিন, আলমারি, টেলিভিশন, নগদ টাকা সব পুড়ে গেছে। এখন পরনের কাপড় ছাড়া আমাদের আর কিছুই নেই।
তিনি আরও বলেন, যে বাড়িতে এত দিন পরিবার নিয়ে বসবাস করেছি, সেই বাড়িই এখন ছাই। নয়জন মানুষ নিয়ে কোথায় থাকব, কী খাব, সন্তানদের পড়াশোনা কীভাবে চালাবো তা কিছুই বুঝতে পারছি না।
প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয় শিক্ষক রেখা দেবনাথ বলেন, আমার জীবনে এত ভয়াবহ আগুন নিজের চোখে কখনো দেখিনি। আগে টেলিভিশনে আগুন লাগার ঘটনা দেখেছি। আজ বাস্তবে আগুনের ভয়াবহতা দেখলাম। চোখের সামনে সবকিছু পুড়ে শেষ হয়ে গেল।
অগ্নিকাণ্ডের পরদিন সকালে বৃহস্পতিবার ২২ অক্টোবর স্থানীয় বাসিন্দারা যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার দুটিকে আর্থিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারাও তাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। তবে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানো পরিবার দুটির সামনে এখন ঘর পুনর্নিমাণ, খাবার জোগাড় এবং সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে নেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
ঘটনার খবর পেয়ে ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার হাফিজুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।
ভোরের আকাশ/আ.র