২৬ হাজার কৃষক পরিবারের স্বার্থে মধ্যবর্তী স্থানে সার ডিলার নিয়োগের দাবি

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ইউনিয়নের প্রায় ২৬ হাজার কৃষক পরিবারের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে মধ্যবর্তী স্থানে সার ডিলার নিয়োগের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
কৃষকদের আশঙ্কা, তাঁদের সুবিধা উপেক্ষা করে দূরবর্তী স্থানে ডিলার নিয়োগ করা হলে সার সংগ্রহে বাড়তি পরিবহন খরচ ও সময় ব্যয় হবে। এতে বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষকেরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন, ব্যাহত হতে পারে কৃষিকাজও।
কৃষিনির্ভর এ ইউনিয়নের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসলের পরিচর্যা প্রতিটি পর্যায়েই প্রয়োজন হয় সার।
কৃষিকাজের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সহজে সার পাওয়া না গেলে তার প্রভাব পড়ে উৎপাদন খরচ ও ফসলের ফলনে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভাটিপাড়া বাজার এলাকায় সার ডিলার নিয়োগের দাবি তুলেছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
কৃষকরা বলছেন, ভাটিপাড়া বাজার ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে হওয়ায় সেখান থেকে বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা তুলনামূলক সহজে সার সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে যাতায়াতের সময় ও পরিবহন খরচ কমবে। পাশাপাশি চাষাবাদের মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহের জন্য দূর-দূরান্তে ছুটতে হবে না তাঁদের।
তবে সার ডিলার নিয়োগের আবেদনকে কেন্দ্র করে মেসার্স নয়ন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নয়ন মণ্ডলের ডিলারশিপ পাওয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন কৃষক। তাঁদের অভিযোগ, কৃষকদের যাতায়াতের সুবিধা ও গুদামের অবস্থান বিবেচনায় না নিয়ে তাঁকে ডিলারশিপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কৃষকদের দাবি, নয়ন মণ্ডল বর্তমানে সংশ্লিষ্ট এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন না এবং তাঁর নিজস্ব গুদামও নেই। ডিলারশিপের আবেদনে উল্লেখ করা ঠিকানায় অন্য ব্যক্তির পানের দোকান রয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কৃষকদের আরও দাবি, প্রস্তাবিত গুদামটি ইউনিয়নের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি এলাকার কৃষকদের সেখান থেকে সার সংগ্রহ করতে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতে পারে। এতে সার পরিবহনে বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হবে। ফলে আর্থিকভাবে তুলনামূলক অসচ্ছল কৃষকেরাই বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন বলে আশঙ্কা তাঁদের।
স্থানীয় কৃষকেরা বলেন, সার ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কিংবা গোষ্ঠীগত স্বার্থের চেয়ে কৃষকদের সুবিধাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে ডিলার নিয়োগ করা হলে সব এলাকার কৃষকের জন্য সার সংগ্রহ সহজ হবে। অন্যথায় চাষাবাদের ব্যস্ত মৌসুমে সার আনতে গিয়ে বাড়তি খরচ ও দুর্ভোগ পোহাতে হবে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্যের বক্তব্যেও নয়ন মণ্ডলের বর্তমান বসবাসের বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই ইউপি সদস্য জানান, নয়ন মণ্ডল তাঁর এলাকার ভোটার হলেও বর্তমানে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ১৬ বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে নয়ন মণ্ডলের পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় চলে যান। তাঁর সাত ভাইয়ের মধ্যে তিন ভাই পরিবারসহ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে এবং অন্য চার ভাই জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে বসবাস করছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
সার ডিলারশিপের আবেদন নিয়ে কৃষকদের আরও অভিযোগ, নয়ন মণ্ডলের আবেদনটি উপজেলা পর্যায় থেকে বাদ দিয়ে জেলায় পাঠানো হয়েছিল। তবে আবেদনটি কেন এবং কী প্রক্রিয়ায় পরবর্তী পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও দাপ্তরিক নথি পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব হবে।
দেশজুড়ে সার ডিলার নিয়োগে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ার তথ্যও এ প্রক্রিয়ার প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি তুলে ধরে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার ৯৩১টি প্রস্তাবিত সার ডিলারশিপের বিপরীতে ৪৬ হাজার ৯৫৫টি আবেদন জমা পড়েছে। সে হিসাবে প্রতিটি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে প্রায় সাড়ে নয়টি আবেদন রয়েছে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ এবং কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদনের ভিত্তিতে নিয়োগের তালিকা প্রকাশ করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ অবস্থায় এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের কৃষকদের দাবি, সার ডিলার নিয়োগের আগে আবেদনকারীর যোগ্যতা, গুদামের বাস্তব অবস্থান, সার সংরক্ষণের সক্ষমতা এবং কৃষকদের যাতায়াতের সুবিধা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি ইউনিয়নের সব এলাকার কৃষকের জন্য সহজে সার সংগ্রহের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকদের প্রত্যাশা, সার ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাত বা ব্যক্তিগত স্বার্থ যেন প্রাধান্য না পায়। বরং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে এমন স্থানে ডিলার নিয়োগ করা হোক, যেখান থেকে অধিকাংশ কৃষক সহজে সার সংগ্রহ করতে পারবেন।
কারণ, সার শুধু কৃষির একটি উপকরণ নয়; এর সহজলভ্যতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়, ফসলের ফলন এবং পরিবারের জীবিকা। তাই ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে কৃষকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়াই এখন তাঁদের প্রধান প্রত্যাশা।
ভোরের আকাশ/ এনউব