শহীদ আসাদের বাড়ির পথ এখন মরণফাঁণ

বাতাসে আজো ওড়ে ১৯৬৯-এর সেই দ্রোহের আগুন। যে আগুন জ্বালিয়েছিলেন শিবপুরের ধানুয়া গ্রামের এক অমিততেজী তরুণ—আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজামান, যিনি আমাদের ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন 'শহীদ আসাদ' নামে। কিন্তু আফসোস! যে বীরের রক্তভেজা শার্ট দেখে একদিন লণ্ডভণ্ড হয়েছিল আইয়ুব শাহীর তখত-ই-তাউস, আজ তাঁর নিজের জন্মভিটায় যাওয়ার পথটিই লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়ে আছে প্রশাসনের সীমাহীন উদাসীনতায়।
প্রতিশ্রুতির ভাঙা হাট, নিরেট অবহেলাশিবপুরের লড়াকু মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল এই ঐতিহাসিক পথটির সংস্কার। বছরের পর বছর ধরে কত বসন্ত এলো-গেল, ক্ষমতার মসনদে বদল হলো কত মুখ! কত মন্ত্রী, কত এমপি এলেন, শহীদ আসাদের স্মৃতির প্রতি ফুল দিয়ে ডালি সাজালেন আর যাওয়ার বেলায় শুনিয়ে গেলেন বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি। কিন্তু সেই আশার বাণী যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। 'করবো, করছি'—এই আশার বাণীতেই শেষ হয়েছে বিগত দিনগুলো, কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
কলেজ গেট থেকে শিমুলতলা: এক নরকযন্ত্রণার নামসরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, শিবপুর কলেজ গেট থেকে শহীদ আসাদের বাড়ি হয়ে শিমুলতলা বাজার পর্যন্ত পুরো রাস্তাটিই এখন যেন এক মরণফাঁদ। কার্পেটিং উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। একটু বৃষ্টি হলেই পথ চেনা দায়, যেন ছোটখাটো এক একটি ডোবা। এই ভাঙাচোরা পথে চলতে গিয়ে প্রায়শই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। উল্টে যাচ্ছে যাত্রীবাহী রিকশা, সিএনজি কিংবা ইজিবাইক। আহত হচ্ছেন সাধারণ পথচারী ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা।
যানবাহনের কান্না, চালকদের দীর্ঘশ্বাসএই পথে নিয়মিত যাতায়াত করা সিএনজি ও অটোরিকশা চালকদের চোখে-মুখে এখন শুধু ক্ষোভ আর হতাশার ছাপ। প্রতিনিয়ত এই ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চালাতে গিয়ে নষ্ট হচ্ছে তাদের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যমটি।
ক্লান্ত ও ক্ষুব্ধ চোখে একজন অটোরিকশা চালক বলেন:"ভাইরে, এইডা কোনো রাস্তা না, এইডা একটা আজাব! এই ভাঙা রাস্তায় গাড়ি চালাইলে হাড়গোড় তো নড়েই, গাড়ির কলকব্জাও কদিন পর পর ভাইঙা যায়। দিনশেষে যা কামাই করি, তার অর্ধেকই চইলা যায় গ্যারেজে গাড়ির পার্টস কিনতে। আমাগো এই কষ্টের কথা হুনার কেউ নাই।"
একই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন এক প্রবীণ সিএনজি চালক: "আসাদ ভাইয়ের নাম বেইচা কতজনে কত কিছু হইলো, কিন্তু আসাদ ভাইয়ের বাড়ির রাস্তাটুকু কেউ ঠিক কইরা দিলো না। এই রাস্তায় প্রতিনিয়ত গাড়ি একপেশে হয়া উল্টাইয়া পড়ে, এক্সিডেন্ট হয়। আমাগো গাড়ির যে পরিমাণ ক্ষতি হয়, সেই লোকসান টানতে টানতে আমরা এখন ফকির হওয়ার পথে।"
উপসংহার ও আকুতিইতিহাসের মহানায়ক শহীদ আসাদ কোনো দলের নন, তিনি গোটা জাতির অহংকার। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত জন্মভিটার পথটি এভাবে অবহেলায় পড়ে থাকা কেবল শিবপুরবাসীর জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই লজ্জাজনক। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি—মিথ্যা আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির রাজনীতি বন্ধ করে অবিলম্বে কলেজ গেট থেকে শিমুলতলা বাজার পর্যন্ত এই সড়কটির টেকসই সংস্কার করা হোক। আসাদের রক্তে কেনা স্বাধীন দেশে তাঁর বাড়ির পথটি অন্তত দুর্ঘটনার অভিশাপ থেকে মুক্তি পাক।
ভোরের আকাশ/ এনউব