কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি কমলেও কাটেনি দুর্ভোগ

উজানের ঢল পুরোপুরি কমে আসায় কুড়িগ্রামের সবকটি প্রধান নদ-নদীর পানি টানা চার দিন ধরে কমছে।
২৯ জুন থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানি ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার নিচে অবস্থান করছে। তবে পানি কমলেও জেলার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বিশেষ করে চিলমারী, সদর, ফুলবাড়ী, উলিপুর, রাজারহাট ও রৌমারী উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। শুধু চিলমারীতেই অন্তত ৭০টি পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে, আর জেলার প্রায় ৪০টি স্থানে নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় শতাধিক পরিবার হারিয়েছে তাদের ভিটেমাটি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) বিকেল ৩টা পর্যন্ত কুড়িগ্রাম পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি নেমে এসেছে ২৪ দশমিক ৯৫ মিটারে, যা বিপৎসীমার ১ দশমিক ১০ মিটার নিচে।
তালুক সিমুলবাড়ী পয়েন্টে পানি ২৯ দশমিক ৪৯ মিটার, দুধকুমারের পাটেশ্বরী পয়েন্টে ২৮ দশমিক ৮১ মিটার, ব্রহ্মপুত্রের নুনখাওয়া পয়েন্টে ২৪ দশমিক ৭৮ মিটার, এ-হাটিয়ায় ২৩ দশমিক ২৮ মিটার, চিলমারী পয়েন্টে ২২ দশমিক ২৯ মিটার এবং তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে ২৮ দশমিক ৭২ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে।
২৯ জুনের তুলনায় সব নদীর পানিই উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রামে ১১ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হলেও অন্য স্টেশনগুলোতে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি।
তবে পানি কমলেও চিলমারী উপজেলার চর কড়াইবরিশাল, বিশারপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ও শাখাহাতি এলাকায় গত পাঁচ দিনে অন্তত ৭০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে প্রায় ৩০০ মিটার হেরিং রাস্তা, বিদ্যুতের খুঁটি, গাছপালা ও কয়েক হেক্টর ফসলি জমি। আরও দুই শতাধিক পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ পাশের চরে, আবার কেউ উঁচু স্থানে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছেন।
চর কড়াইবরিশাল এলাকার লাভলী বেগম বলেন, “হঠাৎ ভাঙন শুরু হওয়ায় ঘর সরানোর সময়ও পাইনি। এখন থাকারও কোনো জায়গা নেই।” শাখাহাতি এলাকার ফারুক মিয়া বলেন, “অন্য চরে জমি নিয়ে আশ্রয় নিয়েছি, কিন্তু নদী ভাঙলে সেটিও হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রহ্মপুত্রে ভয়াবহ ভাঙন চললেও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয়। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে চর কড়াইবরিশাল নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১ নম্বর চিলমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চর শাখাহাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঢুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কড়াইবরিশাল বাজার, চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, নির্মাণাধীন বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, মসজিদ, মাদরাসাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
চিলমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, "এ পর্যন্ত ৭০ থেকে ৮০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। আরও ২০০ থেকে ৩০০টি পরিবার ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোর সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।”
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল ইসলাম বলেন, "জেলায় প্রায় ৪০টি স্থানে নদীভাঙন শুরু হয়েছে। চরাঞ্চলের জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকলেও দেড় হাজার জিও ব্যাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং সেগুলো ফেলা হচ্ছে।" তবে সরেজমিনে ভাঙনকবলিত এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি।
চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, "প্রায় ৭০টি পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে। তাদের শুকনো খাবার ও জিআরের চাল দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যাতে নিরাপদ স্থানে ঘর সরিয়ে নিতে পারে, সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা দুই শতাধিক পরিবারের বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”
ভোরের আকাশ/ র.ই